Masud Rana Nehal

Masud Rana Nehal

Share

Dhaka

24/09/2026

উলুবনে_মুক্তো
পর্ব_৪+৫
সূচনা_জাফরিন

"সালমান খান ভক্ত !" মহীউদ্দীন খান সওদাগর চোখেমুখে চরম বিস্ময় আর বিরক্তি ফুটিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুই কি পাগল হয়েছিস এজলাস?কোথাকার এক নায়ক বিয়ে করেনি বলে তোকেও চিরকুমার হয়ে ঘুরতে হবে? ওর মতো ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা আছে তোর?"

​এজলাস দেয়ালের চিত্রে চোখ রেখে নির্ভাবনায় কলার ঝাঁকাল। "টাকা দিয়ে কী করব আব্বাজান? স্বাধীনতায় কোনো আপস নেই। ভাইয়া তো আছে, তাকেই বিয়ে করিয়ে দিন।"

​বৈঠকখানার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সারহান এবার কাশির ভান করে নিজের উপস্থিতি জানান দিল। ঘরে ঢুকেই এজলাসের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল, "আমার ঘাড়ে দায় না চাপিয়ে সোজা বল এজলাস,তুই কেন ভয় পাচ্ছিস? তুই না বলতি, তুই কাউকে পরোয়া করিস না? তাহলে একটা সাধারণ মেয়েকে নিজের অধীনে রাখতে তোর এতো ভয় কিসের?"

​এজলাসের ধূসর চোখ দুটো মুহূর্তে বদলে গেল। সারহানের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল, "তুমি আমাকে উস্কানি দিচ্ছ সারহান ভাই? আমি কাকে ভয় পাব? ওই আমির হামজার মেয়েকে? যে একটা বন্ধ ঘরে আমার সামনে থরথর করে কাঁপছিল?"

​কথাটা শুনেই মহীউদ্দীন সওদাগরের ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। চতুর ব্যবসায়ী যেমন শিকারের দুর্বল জায়গায় আঘাত হানেন, তিনি ঠিক সেটাই করলেন। ধীর গলায় বললেন, "তাহলে বিয়েতে সমস্যা কোথায়? যে পরিবার আমাদের অপমান করেছিল, সেই পরিবারের মেয়েকে এই বাড়িতে এনে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রাখার এতো বড় সুযোগ তুই হাতছাড়া করবি এজলাস? তুই না বলতি সওদাগর বংশের অপমান তুই করায়-গন্ডায় উসুল করবি?"

​এজলাস এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মস্তিষ্কে দ্রুত কিছু হিসাব-নিকাশ খেলে গেল।পকেটে থাকা শুভ্র পাথরের পায়েল আর সেই অন্ধকার ঘরে জারিয়ার ভীতিসন্ত্রস্ত চেহারাটা যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

​'মেয়েটাকে বন্দি বানিয়ে নিজের ইশারায় নাচানোর সুযোগ?'-চিন্তাটা এজলাসের অহংকারে অদ্ভুত এক খোরাক জোগাল। সে শীতল হেসে বলল, "ঠিক আছে। তবে আমার একটা শর্ত আছে আব্বাজান। এই বিয়েতে কোনো জাঁকজমক হবে না। কাবিননামায় সই হবে আর মেয়ে সোজা এই বাড়িতে আসবে। কোনো উৎসবের নাটক আমি সহ্য করব না।"

​মহীউদ্দীন সওদাগর সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন, "ঠিকাছে। তুই যা চাবি তা-ই হবে।"
তিনি চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে ছেলের দিকে আরেকবার তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, "আর শোন, বিয়ের আগেই চুল-দাড়ি ছাটিয়ে ভদ্র হয়ে নিস। না হয় প্রথম দিনেই জংলী ভাল্লুক ভেবে তোর নতুন বউ চিৎকার দিয়ে বাপের বাড়ি পালাবে!"

​এজলাস নিজের রাশভারী চেহারার ঘন দাড়ি-গোঁফে হাত বুলিয়ে মুখ বাঁকাল, "আব্বা, এটা ট্রেন্ডি স্টাইল! ভাল্লুক হতে যাব কেন?"

​"যেটা বললাম সেটাই করবি," মহীউদ্দিন সাহেব গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন, "তোর বয়সের চেয়ে আমার অভিজ্ঞতার বয়স বেশি, বুঝলি?"

:
:
​এদিকে সহপাঠীরা যখন পরীক্ষা শেষের আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন জারিয়া নিঃশব্দে ঘরে বসে আছে মুখ গোমরা করে।
ড্রয়িংরুমে কয়েকটা মিষ্টির প্যাকেট রাখা। মুনিরা বেগম চোখ মুছে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।

​আমির হামজা মেয়েকে সামনে ডেকে এনে বসালেন। তার হাত দুটো চেপে ধরে কেঁদে ফেললেন একসময়ের এই শক্ত মনের মানুষটি। "আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। তোর বাবা আজ হেরে গেছে। মহীউদ্দীন সওদাগর পরশু সন্ধ্যায় তোকে নিতে গাড়ি পাঠাবে। কোনো বড় অনুষ্ঠান হবে না, শুধু কাজী ডেকে আকদ করা হবে।"

​জারিয়ার ভেতরের সমস্ত অনুভূতি যেন এক নিমেষে অবশ হয়ে গেল। সে কোনো কান্না করল না, কোনো চিৎকার করল না। শুধু শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "বাবা, ওই লোকটা... মানে এজলাস, সেও কি এই বিয়েতে রাজি?"

​আমির হামজা নিচু স্বরে বললেন, "হুম। উনারা তোকে তাদের ঘরের বউয়ের মর্যাদা দেওয়ার কথাই বলেছেন জারিয়া। কিন্তু তুই মনে রাখিস, তোর বাবা এখনো মরে যায়নি। কোনো অন্যায় হলে এক মুহূর্তও ওখানে থাকবি না।"

​জারিয়া নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চেহারাটার দিকে তাকাল। যে চোখ দুটোতে কাল পর্যন্ত অনেক স্বপ্ন ছিল, আজ সেখানে কেবল এক গভীর শূন্যতা।

​সেই ধূসর চোখের লোকটা যখন তাকে ২৪ ঘণ্টা বন্ধ ঘরে আটকে রেখেছিল। তখন সে ভেবেছিল ওটা হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি,দেখতে কঠোর হলেও সে মানুষ ভালো, তাইতো ছেড়ে দিয়েছে জারিয়াকে কিন্তু এখন সে বুঝছে, ওটা ছিল একটা সুনির্দিষ্ট ফাঁদ! কিন্তু কেন? কেবল বড় বোনের ভাঙা বাগদানের শোধ নিতে তাকে এভাবে নিজের শিকার বানাল তারা?এ কেমন বিয়ে? যার সাথে বিয়ে হবে তাকেই তো দেখা হয়নি এখনো!

​জারিয়া হাত জোর করে আয়নার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগলো আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,'তুমি যদি কোনো শয়তান হও এজলাস, তবে আমি তোমাকে সহজে জিততে দেব না। আঘাত সহ্য করতে পারি, কিন্তু দাসী হয়ে বাঁধার শৃঙ্খল পরে মাথা নোয়াব না।'

আচমকাই যেন তার কিশোরী মন প্রতিবাদ করে উঠলো।অথচ যে মন আজ পর্যন্ত বাবা মায়ের অবাধ্যতা করেনি।

​দুই দিন পর__

​মণিকাঞ্চন ভিলার গাড়ি এসে দাঁড়াল আমির হামজার বাড়ির সামনে। কোনো সানাই বাজল না, কোনো আলোকসজ্জা হলো না।নিয়ম মতে বিয়ের কনের সাজে জারিয়া কাজী সাহেবের সামনে গিয়ে বসল।

​কাবিননামায় সই করার সময় জারিয়ার হাত সামান্য কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। তিনবার 'কবুল' বলার সাথে সাথে তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে গেল।

​সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতেই জারিয়া পা রাখল মণিকাঞ্চন ভিলায়। বিশাল প্রাসাদতুল্য বাড়ি, কিন্তু প্রতিটি কোণে যেন থমথমে এক নীরবতা।

​মোহসেনা বেগম ও দাদী আম্বিয়া বেগম তাকে সাদরে গ্রহণ করলেও সারহানের চোখে ছিল এক অপরাধবোধের ছাপ।বড় ভাই সামিন এবং তার স্ত্রী কেমন যেন বাঁকা নজরে দেখল জারিয়াকে,খুব একটা উদারতার প্রকাশ ঘটেনি তাদের আচরণে।

​রাত বারোটা।

​এজলাসের সুসজ্জিত বিশালাকার ঘরে খাটের ওপর চুপচাপ বসে ছিল জারিয়া। লাল বেনারসি আর গহনার ভারে তার শরীরটা ক্লান্ত হলেও মস্তিষ্ক ছিল অত্যন্ত সতর্ক।

​হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো।জুতোর শব্দ তুলে ঘরে প্রবেশ করল এজলাস। গায়ের কালো পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, মুখে কোনো হাসি নেই।

​সে ধীর পায়ে জারিয়ার দিকে এগিয়ে এল। খাটের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে জারিয়ার চিবুকটা তুলে ধরল।

​জারিয়া তীব্র চোখে এজলাসের ধূসর চোখের দিকে তাকাল। এজলাসের ভ্রূ কিছুটা কুঁচকে গেল,মেয়েটির বিস্ফোরিত চোখ দেখে।
একটু ছুঁতেই জারিয়া যেন কারেন্টের শক খেল! ভীষণ ভয়ে কেঁপে উঠে মুখ ফুটে বলেই ফেলল, "আ-আপনি?! আপনি তো সেই গুন্ডা লোকটা! আপনি... আপনি এই ঘরে কেন এলেন?!"

​এজলাস চোখ গোল গোল করে চরম অবাক হয়ে বলল, "গুন্ডা লোক মানে? কী যা তা বলছ!"

​জারিয়া কাঁপা গলায় নিজের শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে বলল, "মানে আবার কী? আপনি আমাকে ছুঁলেন কেন? এখনই বের হন এখান থেকে, না হলে আমি কিন্তু চেঁচাব!"

​হঠাৎ করেই এজলাসের মাথায় আব্বার সেই বিখ্যাত উক্তিটা বিজলীর মতো চমকে উঠল-‘না হয় জংলী ভাল্লুক ভেবে বউ পালাবে!’

​'সর্বনাশ! আব্বা তো দেখি সেই খেলোয়াড়!' মনে মনে কথাটা ভেবে এজলাসের আর হাসির গমক আটকে রাখা দায় হলো। সে নিজের চাপদাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে মুখে একগাল মিষ্টি কিন্তু কৌতুকপূর্ণ হাসি ঝুলিয়ে বলল, "হুমম, তা ম্যাডাম... গুন্ডা তো চিনলেন, কিন্তু এই গুন্ডাই যে আপনার স্বামী আর বিয়ের খাতা সই করে এ ঘরে এসেছে, সেটা কি আবার নতুন করে বুঝিয়ে দিতে হবে?"

​এজলাস পকেট থেকে সেই শুভ্র পাথরের পায়েলটা বের করে জারিয়ার কোলে ছুঁড়ে ফেলল। শীতল গলায় বলল, "স্বাগতম আমার নরকে জারিয়া পাখি, ওহ সরি আমার ঘরে।"

​জারিয়া পায়েলটার দিকে তাকাল, তারপর এক মুহূর্ত না ভেবে পায়েলটা তুলে নিয়ে সোজাসুজি এজলাসের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল। পায়েলটা এজলাসের গাল ঘেঁষে মেঝেতে গিয়ে আছড়ে পড়ল।

​জারিয়া খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা এজলাসের চোখের দিকে চোখ রেখে বলল, "নরককে ভয় তারাই পায় যাদের হারানোর কিছু থাকে। আমার হারিয়ে যাওয়ার আর কিছু বাকি নেই এজলাস মেহমুদ । খেলায় চাল আপনি চেলেছেন ঠিকই, কিন্তু শেষটা কেমন হবে তা সময় নির্ধারণ করবে!"

​এজলাসের গালে পায়েল লাগার জায়গায় লাল ছোপ পড়ে গেছে। সে হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই সাধারণ মেয়েটার সাহস যে এতদূর গড়াবে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। তার ধূসর চোখে হিংস্রতার চরম শিখা জ্বলে উঠল।

​চলবে...

জারিয়ার ছুড়ে মারা পায়েলের তীব্র আঘাত এজলাসের গালে তো বটেই, তার বিশাল অহংকারে গিয়েও সজোরে লাগল। কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ থেকে গাল ঘেঁষে হাত বোলালো সে। গালে হালকা লাল দাগ ফুটে উঠেছে।চোখ দুটোতে যেন এক মুহূর্তেই হিংস্র আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠল।

​জারিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বুকটা দুরুদুরু কাঁপলেও মুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই।

​এজলাস ধীর পায়ে এক পা এগিয়ে জারিয়ার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তার মেজাজ এখন আসমানের চূড়ায়। কিন্তু নিজেকে সংযত করে অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলল, "সাহস তো কম না! এই এজলাস মেহমুদকে মুখের ওপর জিনিস ছুড়ে মারলি? বাপের বাড়ি থেকে কি ভদ্রতার পাঠ শেখায়নি?"

​জারিয়া এক চুলও পেছাল না। চিবুক উঁচিয়ে অত্যন্ত ঝাঁঝালো গলায় উত্তর দিল, "ভদ্রতা পাওয়ার যোগ্যতা সবাই রাখে না, চরিত্রহীন! বন্ধ ঘরে অচেনা মেয়েকে আটকে রাখা গুন্ডাদের থেকে ভদ্রতা আশা করাই পাপ। আর আপনার এই বেঈমান রঙের চোখ দেখে আমি একবিন্দুও ভয় পাই না, বুঝেছেন?"

​"কী বললি তুই?" এজলাস এক মুহূর্তের জন্য যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। 'চরিত্রহীন'? 'বেঈমান রঙের চোখ'? মহীউদ্দীন খান সওদাগরের ছোট ছেলে, যাকে শহরের অর্ধেক লোক ভয়ে আর বাকি অর্ধেক সম্মানে সমীহ করে চলে, তাকে এক পুতুল মার্কা মেয়ে এইসব শব্দে ভূষিত করছে?

​এজলাস বাঁকা হেসে চোখ দুটো ছোট ছোট করে বলল, "চোখের রঙ ধূসর বলে বেঈমান হয়ে গেল? আর এত রাতে এই ঘরে তোর সাথে একা আছি বলে আমি চরিত্রহীন? শোন ম্যাডাম, কাজী ডেকে কবুল পড়ে এই ঘরে আনিয়েছি তোকে। কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য করতে আনিনি। তুই এখন আমার বিবাহিত স্ত্রী!"

​"কাগজে-কলমে বিয়ে হলেই কেউ স্বামী হয়ে যায় না," জারিয়া শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আপনার এই শয়তানি চাল আমি বুঝে গেছি। কিন্তু মনে রাখবেন, শৃঙ্খল পরাতে পারেন, কিন্তু দাসী বানাতে পারবেন না। এই বেঈমান রঙের চোখের গুন্ডার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, কোনোদিন হবেও না!আর হ্যাঁ এই যে আমাকে" তুই" করে বলছেন এতেই বোঝা যাচ্ছে আপনি কতটা ভদ্রতার শিক্ষা পেয়েছেন। "

​কথাটা শেষ করেই জারিয়া দ্রুত পায়ে গিয়ে খাটের একপাশের কোলবালিশটা তুলে নিল। তারপর একঝটকায় সেটা সোফার ওপর ছুড়ে মেরে বলল, "আপনার নরক আপনি সামলান। সোফায় গিয়ে ঘুমান!"

​এজলাস হাঁ করে তাকিয়ে রইল। সে নিজের বিশালাকার ঘরে দাঁড়িয়ে নিজেরই নতুন বউয়ের কান্ড দেখছে। যে মেয়েটা কিছুদিন আগে অন্ধকার ঘরে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল, সে আজ তাকে নিজের ঘরেই দিকনির্দেশনা দিচ্ছে!

​এজলাস রাগে নিজের চুল টেনে ধরে হাসার চেষ্টা করল, "আমি সোফায় ঘুমাব? মাই ফুট! এই ঘর আমার, এই খাট আমার। তোর.. বলতে গিয়ে আবার সংশোধন করে বলল" অতই সমস্যা হলে আপনি মেঝেতে শুয়ে পড়ুন।"

​"কখনোই না! লাল বেনারসি পড়ে আমি মেঝেতে শোব কেন?" জারিয়া সোজা গিয়ে খাটের এক কোণে নিজের কাঁথা-বালিশ গুছিয়ে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে রূঢ় গলায় বলল, "একদম আমার দিকে আসবেন না। এলে কিন্তু বাটি ছুড়ে মারব!"
তারপর জারিয়া বিড়বিড় করে পড়ল:
"ওয়াসবির আলা মা ইয়াকুলুনা ওয়াহজুরহুম হাজরান জামীলা।"

"এই যে কী বললে তুমি?"

বললাম:
"তারা যে মন্দ কথা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ করো এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে এড়িয়ে চলো।"
(সূরা আল-মুযযাম্মিল: ১০)

​এজলাসের মেজাজ চড়ে আবার নেমে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, "আব্বা ঠিকই বলেছিল... জংলী ভাল্লুকের ঘরে আস্ত একটা বাঘিনী এনে তুলেছি! বাটি ছুড়ে মারবে,অপমান ও করবে... হুহ!"

​নিজের চওড়া দাড়ি-গোঁফে হাত বুলাতে বুলাতে এজলাস সোফার দিকে পা বাড়াল। আজকের রাতে রাজকীয় খাটের অধিকার ছেড়ে তাকে এই ছোট সোফাতেই শরীর বাঁকিয়ে শুতে হচ্ছে, ভেবেই তার অহংকারে চোট লাগল। কিন্তু এই একগুঁয়ে মেয়েটার সাথে এখন মাঝরাতে মারা|মারি করার কোনো ইচ্ছা তার নেই।

​সোফায় আধশোয়া হয়ে বালিশটা মাথার নিচে দিয়ে এজলাস অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, 'দাঁড়া জারিয়া পাখি, বাঘিনীগিরি বের করছি তোর! এই ঘরে তুই নিজ ইচ্ছায় এসেছিস, কিন্তু এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা আমার ইশারায় নির্ধারিত হবে।'
:
:
:
​পরদিন সকাল।

​মণিকাঞ্চন ভিলার রান্নাঘরে সকাল থেকেই বেশ হাঁকডাক। নতুন বউয়ের আজ প্রথম সকাল। মোহসেনা বেগম আর দাদী আম্বিয়া বেগম জারিয়াকে বেশ যত্ন করেই নাস্তার টেবিলে ডেকে বসালেন।

​তবে পরিবেশটা খুব একটা হালকা ছিল না। বড় ভাই সামিন আর তার বউ মেহজাবীন বাঁকা নজরে জারিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল। মেহজাবীন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "তা জারিয়া, আমাদের ছোট সাহেবের সাথে প্রথম রাত কেমন কাটল? এজলাস তো আবার একটু কড়া মেজাজের, ভয় পাওনি তো?"

​জারিয়া শান্ত হাতে পরোটা মুখে দিতে দিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "ভয় পাব কেন ভাবি? মেজাজ কড়া হতে পারে, কিন্তু মানুষ তো আর জংলী ভাল্লুক নয়! তবে হ্যাঁ, সোফায় শুয়ে ঘুমানোর অভ্যাস উনার মন্দ নয়।"

​কথাটা শোনামাত্রই টেবিলে উপস্থিত সবাই থমকে গেল। মহীউদ্দীন সওদাগর চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এজলাসের দিকে তাকালেন।

​এজলাস ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। পরনে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো কিছুটা উষ্কখুষ্ক। জারিয়ার কথাটি তার কানে পৌঁছাতেই সে সিঁড়িতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

​মহীউদ্দীন সাহেব কৌতুকপূর্ণ চোখে ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে কেশে উঠলেন, "হুমম... তা এজলাস, বিয়ের প্রথম রাতেই সোফায় প্রমোশন পেয়ে গেলি? আব্বার কথা না শুনে চুল-দাড়ি কাটলি না, তার প্রতিফল পাচ্ছিস তো?"

​সারহান টেবিলের একপাশে বসে জুস খাচ্ছিল, সে হুট করে হেসে ফেলে জুস গিলতে গিয়ে কাশতে লাগল। সামিনও নিজের হাসি চেপে গম্ভীর হওয়ার ভান করল।

​এজলাসের ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠল। সে হনহন করে হেঁটে এসে নাস্তার টেবিলে জারিয়ার ঠিক মুখোমুখি চেয়ারটাতে বসল। চোখের মণি দুটোতে বিষ ছড়িয়ে জারিয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "কেউ কেউ আবার বেশি কথা বলে নিজের বিপদ ডেকে আনে, আব্বাজান।"

​জারিয়া মিষ্টি একটা হাঁসি দিয়ে বলল, "মিথ্যা বলা তো পাপ, তাই না আব্বাজান? যা সত্য তাই বললাম।"

​মহীউদ্দীন সওদাগর মুচকি হেসে বললেন, "একদম ঠিক বলেছিস মা। সওদাগর বাড়িতে সত্যি কথা বলার লোকের বড় অভাব ছিল।"

​এজলাস এবার এক কাপ কফি টান মেরে নিজের দিকে নিয়ে চুমুক দিল। মনে মনে সে জ্বলছে। এই মেয়েটা শুধু তার অহংকারে আঘাত করেনি, পুরো পরিবারের সামনে তাকে সোফায় শোয়া স্বামী বানিয়ে ছেড়েছে!

​নাস্তা শেষে জারিয়া যখন নিজের ঘরে গিয়ে দাঁড়াল, ঠিক তখনই এজলাস ঘরে ঢুকে ঝড়ের বেগে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

​জারিয়া চমকে পেছনে তাকাল। এজলাস ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে সেই পরিচিত শীতল হাসি।

​"অনেক তো নাটক হলো পাখি," এজলাস জারিয়াকে দেয়ালের সাথে একপ্রকার আটকে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল, "সবার সামনে আমার সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শোধ কীভাবে নিতে হয়, তা আমার ভালো করেই জানা আছে।"

​জারিয়া বুক ফুলিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "কী করবেন? মারবেন আমাকে? ওই বেঈমান রঙের চোখ দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না, গুন্ডা লোক কোথাকার!"

​এজলাস হুট করেই জারিয়ার খুব কাছে ঝুঁকে এল। তাদের মধ্যে দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। জারিয়ার নিঃশ্বাস আটকে এল, তার হূদস্পন্দন হঠাৎ করেই তীব্র গতিতে চলতে লাগল।

​এজলাস এক হাত দেওয়ালে রেখে অন্য হাতের আঙুল দিয়ে জারিয়ার কানের কাছে ঝুলন্ত চুলের একটি গোছা আলতো করে সরিয়ে দিল। তার শীতল ছোঁয়ায় জারিয়ার শরীরে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেল।

​এজলাস অত্যন্ত মিষ্টি কিন্তু কৌতুকভরা গলায় বলল, "মারব কেন পাখি? শোধ নেওয়ার অনেক রোমান্টিক উপায়ও আছে। তুমি আমাকে 'চরিত্রহীন' বললে, অথচ আমি এখনও চরিত্রহীনের মতো কিছুই করলাম না! ব্যাপারটা কি একটু অন্যায় হয়ে যাচ্ছে না?"

​জারিয়ার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। এজলাসের এই আচমকা রূপ পরিবর্তন আর বাঁকা হাসি দেখে সে এবার সত্যিই কিছুটা ঘাবড়ে গেল।

​"আ-আপনি দূরে সরুন!" জারিয়া এজলাসের বুকে হাত দিয়ে ঠেলার চেষ্টা করল, কিন্তু এজলাস যেন এক শক্ত পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

​এজলাস নিচু হয়ে জারিয়ার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "বাটি ছুড়ে মারার হুমকি দিয়েছিলে না? আজ রাতে কিন্তু কোনো সোফা খালি থাকবে না, পাখি। তৈরি থেকো!"

​কথাটা বলেই এজলাস সোজা হয়ে দাঁড়াল। জারিয়ার রক্তিম আর ভীতিসন্ত্রস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সে এক বিজয়ের হাসি হাসল। তারপর পকেটে হাত দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

​জারিয়া দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতরে যেন এক ভীষণ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। লোকটা স্পষ্টতই তাকে উত্যক্ত করার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে!

​জারিয়া আয়নার সামনে গিয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল আর হাত মুঠো করে বিড়বিড় করে বলল, "চালবাজ বেঈমান! ভাবছ আমাকে এভাবে ভয় দেখিয়ে কাবু করবে? আমি জারিয়া, আপনার এই নকল প্রেম আর শয়তানি চালের জবাব গুনে গুনে ফেরত দেব!"

​সাপ আর নেউলের লড়াই মাত্র শুরু হলো। মণিকাঞ্চন ভিলার এই বদ্ধ ঘরে কার অহংকার আগে ভাঙে, সেটাই এখন দেখার বিষয়!

​চলবে...

24/09/2026

রত্নগর্ভা মা
পর্ব ০৬
শাহেদ খান

আজকের দিনের কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না। এ প্লাস পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল, এতদিনের সব কষ্ট যেন এক মুহূর্তের জন্য আমাদের ঘর থেকে দূরে সরে গেছে। আম্মার মুখে যে হাসিটা দেখেছিলাম, সেই হাসিটা দেখার জন্যই যেন আমি এতদিন পড়াশোনা করেছি। রাতে ঘুমানোর সময়ও বারবার মনে হচ্ছিল, সত্যিই আমি গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছি। আমার চোখের সামনে শুধু আম্মার হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠছিল।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আম্মা আগের মতো কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে লাগলো। আমি তখনও বিছানায় বসে ছিলাম। আম্মা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, “মা, আজকে আর একটু ঘুমা। তুই কি আজকেও ছোট ছোট বাচ্চাগুলারে পড়াবি?

আমি হেসে বললাম, “হ আম্মা। এখন থেইকা আমি সকালে আর বিকালে দুই বেলা পড়ামু। তাতে বাচ্চাগুলারও সুবিধা হইবো, আমারও কিছু টাকা আয় হইবো।”
আম্মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “তুই নিজের পড়াশোনার দিকটা আগে দেখবি মা। অন্যের বাচ্চারে পড়াইতে গিয়া নিজের পড়াশোনা নষ্ট করিস না।”
আমি বললাম, “না আম্মা, আমি সব সামলাইয়া নেবো। তুমি শুধু চিন্তা কইরো না।”

আম্মা কাজে চলে যাওয়ার পর আমি হালকা কিছু খেয়ে বাইরে চট বিছিয়ে বাচ্চাদের পড়াতে বসে গেলাম। আগে যেখানে বিকালে কয়েকজন বাচ্চা পড়তে আসতো, এখন তাদের সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। আমার এ প্লাস পাওয়ার খবর বস্তির অনেকেই জেনে গিয়েছিল। তাই অনেক বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের আমার কাছে পড়াতে নিয়ে আসতো।

কেউ এসে বলতো, “রাইমা মা, আমার মেয়েটারে একটু ভালো কইরা পড়াইও। ও পড়াশোনায় খুব কাঁচা।”
আবার কেউ বলতো, “মা, আমার ছেলেটা অঙ্ক কিছুতেই বুঝে না। তুই একটু দেখিস।”
আমি সবাইকে নিজের ছোট ভাই-বোনের মতো করে পড়াতাম। কারণ আমি জানতাম, পড়াশোনা করার সুযোগ পাওয়া কত বড় একটা বিষয়।
সকালে কয়েকজন ছোট বাচ্চাকে পড়িয়ে দুপুরে একটু বিশ্রাম নিতাম। তারপর বিকেলে আবার বাচ্চাদের নিয়ে বসতাম। রিমি আর রুবিও আমার পাশে বসে নিজেদের পড়াশোনা করতো।

একদিন বিকেলে রিমি একটা অঙ্ক নিয়ে আমার কাছে এসে বললো, “আপু, এই অঙ্কটা আমি কিছুতেই বুঝতেছি না।”
আমি ওর খাতা নিয়ে বললাম, “এখানে ভুল করছিস। আগে এইটা বুঝ, তারপর পরের ধাপে যাস।”
রিমি মন দিয়ে আমার কথা শুনলো। কয়েকবার বুঝিয়ে দেওয়ার পর ও নিজেই অঙ্কটা করে ফেললো।
আমি বললাম, “দেখছিস, মন দিয়া চেষ্টা করলে কোনো কিছুই কঠিন না।”
রিমি হেসে বললো, “আপু, আমি তোর মতোই ভালো ছাত্রী হমু।”

আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “তুই আমার চাইতেও ভালো ছাত্রী হবি। শুধু মন দিয়া পড়বি।”
রুবি তখন পাশে বসে বললো, “আর আমি?”
আমি হেসে বললাম, “তুইও ভালো ছাত্রী হবি। তোরা দুইজনই অনেক বড় হবি।”

আমাদের তিন বোনের মধ্যে তখন পড়াশোনা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে সেই প্রতিযোগিতায় একজন ভালো করলে অন্য দুজন আরও বেশি উৎসাহ পেতাম।

এদিকে আব্বার জীবনও নিজের মতো করে চলছিল। আমাদের খবর নেওয়ার জন্য সে কোনোদিন খোজ করেনি। কিন্তু গ্রামের বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে মানুষের মুখে আব্বার খবর শুনতাম। আমরা গ্রামের দুইজনের নাম্বার জোগাড় করেছিলাম।

আমাদের আব্বার প্রথম ছেলে হওয়ার তিন বছর পর তার আরও একটা ছেলে হয়েছে। দ্বিতীয় ছেলের জন্মের খবর শুনে আব্বার খুশির যেন আর কোনো সীমা ছিল না। তার দুই ছেলে হয়েছে, তার বংশের বাতি জ্বলছে, তার শেষ বয়সের লাঠি হয়ে গেছে—এই ভেবে সে যেন নিজের জীবন নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
আব্বা তখন দিনরাত কাজ করতো। তার দুই ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক চিন্তা করতো। ছেলেদের ভালো স্কুলে পড়াবে, বড় করবে, তাদের জন্য জমি-জমা করবে—এইসব নিয়েই তার যত ভাবনা।
গ্রামের মানুষও তাকে বলতো, “তোর তো এখন দুই দুইটা পোলা। শেষ বয়সে আর কোনো চিন্তা নাই।”
আব্বা নাকি তখন গর্ব করে বলতো, “হ, আমার দুই পোলা আছে। আমার আর কীসের চিন্তা?”

কিন্তু আমার আম্মা এসব নিয়ে কোনো কথা বলতো না। সে কখনো আমাদের সামনে আব্বার বিরুদ্ধে কিছু বলতো না। বরং বলতো, “ওর জীবন ওর মতো চলুক। তোরা নিজের জীবনটা ঠিক কইরা গড়।”
আমি আম্মার কথা শুনে বুঝেছিলাম, সে এখন আর অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চায় না।
এর মধ্যে আমার কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় চলে এলো। আমি একটা ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম। কলেজের নাম শুনে আম্মা প্রথমে খুশি হলেও ভর্তি খরচের কথা শুনে একটু চিন্তায় পড়ে গেল।
রাতে আম্মা হিসাব করতে করতে বললো, “মা, কলেজে ভর্তি হইতে তো অনেক টাকা লাগবো। এত টাকা আমি একসাথে কই থেইকা জোগাড় করমু?”

আমি তখন আম্মার পাশে বসে বললাম, “আম্মা, বেশি খরচের কলেজে ভর্তি হইতে না পারলে অন্য কোথাও ভর্তি হমু। তুমি এত চিন্তা কইরো না।”
আম্মা বললো, “না মা, তুই যেই কলেজে পড়লে ভালো করতে পারবি, সেই কলেজেই পড়বি। তোর পড়াশোনার জন্য আমি যতটা পারি করমু।”
পরদিন আম্মা তার স্যার আর ম্যাডামকে আমার কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা জানালো। তারা আমার রেজাল্টের কথা জানতেন। খবর শুনে তারা বললেন, “রাহেলা, রাইমাকে ভালো একটা কলেজে ভর্তি করাও। টাকার জন্য যেন ওর পড়াশোনা নষ্ট না হয়।”
আম্মা তখন নিজের সমস্যার কথা বলেছিল। এরপর স্যার-ম্যাডাম আমার ভর্তির অর্ধেকেরও বেশি টাকা দিয়ে দিলেন।

আম্মা টাকা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, “আপনারা আমার মেয়েদের জন্য এত কিছু করেন, আমি আপনাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারমু না।”
ম্যাডাম তখন বলেছিলেন, “রাহেলা, এটাকে ঋণ মনে করবে না। তোমার মেয়েরা ভালো মানুষ হোক, ভালো পড়াশোনা করুক, এইটাই আমাদের আনন্দ।”
আমার ভর্তি শেষ হওয়ার পর আমি নতুন কলেজে যাওয়া শুরু করলাম। প্রথম দিন কলেজের গেট দিয়ে ঢোকার সময় আমার বুকের ভেতর অন্যরকম একটা অনুভূতি হচ্ছিল।

কলেজে পড়াশোনার চাপ ছিল অনেক। কিন্তু আমি এগুলো ভ*য় পাইনি। কারণ এতদিনের কষ্ট আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে, সুযোগ পেলে সেটা ধরে রাখতে হয়। আমার মতো অনেক মেয়ের পড়াশোনা শুধু টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তাই আমি কোনোভাবেই আমার সুযোগটা নষ্ট করতে চাইনি।

সকালে কলেজে যেতাম। ফিরে এসে ছোট বাচ্চাদের পড়াতাম। তারপর নিজের পড়াশোনা করতাম। রিমি আর রুবিও নিজেদের পড়াশোনা করতো। রাতে তিন বোন পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করতাম।
আম্মা কাজ থেকে ফিরে আমাদের তিনজনকে একসাথে পড়তে দেখলে অনেক খুশি হতো। কখনো খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলতো, “তোরা তিনজন একসঙ্গে পড়তেছিস, এই দৃশ্য দেখলেই আমার সব কষ্ট দূর হইয়া যায়।”

রিমি তখন আমার মতোই পড়াশোনায় ভালো করতে শুরু করেছে। স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে ও ভালো ফল করতো। রুবিও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করছিল। ও কোনো বিষয়ে আটকে গেলে আমি আর রিমি মিলে ওকে বুঝিয়ে দিতাম।
একদিন রাতে আমরা তিন বোন পড়তে বসেছিলাম। হঠাৎ রিমি বললো, “আপু, আমরা তিনজন যদি একদিন অনেক বড় হই, তখন আম্মারে কী করমু?”

আমি বই থেকে মুখ তুলে বললাম, “আম্মারে একটা ভালো বাসা কিনে দিমু।”
রুবি সঙ্গে সঙ্গে বললো, “আমি আম্মারে অনেক সুন্দর গাড়ি কিনে দিমু।”
রিমি বললো, “আর আমি আম্মারে কোনোদিন কাজ করতে দিমু না।”

আমি ওদের দুইজনের দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, “এইটাই তো আমাদের তিনজনের স্বপ্ন। আমরা যে যেখানেই থাকি, আম্মারে ভালো রাখবো।”
আমাদের তিনজনের চোখে তখন কত স্বপ্ন ছিল, সেটা হয়তো আমরা নিজেরাও বুঝতাম না।
এভাবেই সময় কেটে যেতে লাগলো। দেখতে দেখতে আমার এইচএসসি পরীক্ষা সামনে চলে এলো। একই সময়ে রিমির এসএসসি পরীক্ষাও সামনে এসে দাঁড়ালো। আমার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই রিমির পরীক্ষা শুরু হবে।

আমাদের ছোট ঘরটা যেন বই দিয়ে একটা লাইব্রেরী হয়ে গেছে। আমি আমার এইচএসসির পরিক্ষার বই নিয়ে বসতাম, রিমি এসএসসির পরিক্ষার বই নিয়ে বসতো, আর রুবি তার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।

রুবি মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলতো, “আপু, তোরা দুইজন এত পড়স ক্যান?”
আমি হেসে বলতাম, “তুই বড় হইলে বুঝবি। এখন তুই তোর পড়া শেষ কর।”
রুবি বলতো, “আমি বড় হইলে তোদের চাইতেও বেশি পড়মু।”
রিমি তখন হেসে বলতো, “আগে তোর ক্লাসের পড়া শেষ কর, তারপর বড় বড় কথা কইস।”
আমরা তিন বোন হাসতাম, আবার বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে দিতাম।

পরীক্ষা যতই কাছে আসছিল, আম্মা ততই আমাদের নিয়ে চিন্তা করছিল। যদিও সে পড়াশোনার কিছুই বুঝতো না, তারপরও প্রতিদিন রাতে আমাদের পাশে বসে থাকতো। কখনো পানি এনে দিতো, কখনো মুড়ি সামনে এনে দিতে।, আবার বলতো, “মা, বেশি রাত জাইগা থাকিস না। শরীর খারাপ হইয়া যাইবো।”
আমি বলতাম, “আম্মা, পরীক্ষা শেষ হইলেই তো ঘুমামু। এখন একটু কষ্ট করতেই হইবো।”

আম্মা তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো, “তোরে ছোট থেইকা এত কষ্ট করতে দেখছি মা। আল্লাহ যেন তোর কষ্টের ভালো ফল দেয়।”
আমি আম্মার দিকে তাকিয়ে বলতাম, “আম্মা, তুমি শুধু দোয়া কইরো।

চলবে...?

গল্পটি তারাতাড়ি শেষ করে দিবো?

24/09/2026

“আব্বুর শার্টের পকেট থেকে আজ ৮০০ টাকা নিয়েছি। তারপর শার্ট টা লুকিয়ে রেখেছি। কয়েক দিন পরে যখন শার্ট টা খুঁজে পাবে, ততদিনে টাকার কথা ভুলেই যাবে।”

দোকানের এক কোণে বছর সতেরো-আঠারোর একটা ছেলে তার বন্ধুর সঙ্গে বসে সিগা*রেট ফুঁকছিল। ছেলেটার কথাগুলো প্রথমে খুব একটা খেয়াল করিনি, কিন্তু হঠাৎ তার একটা কথা কানে আসতেই চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আমি চুপ করে তার দিকে তাকালাম।

কথাটা বলে ছেলেটা এমনভাবে হেসে উঠল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোনো কাজ করে ফেলেছে। তার পাশে বসে থাকা বন্ধুটাও হেসে বলল, “তোর আব্বু যদি এখনই শার্ট টা খুঁজে পায়, তাহলে তো ধরা খেয়ে যাবি।”

ছেলেটা সিগা**রেটের ধোঁয়া ছেড়ে আ*ত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, “আমার আব্বুকে আমি চিনি। উনি কয়েকদিন খুঁজবেন, তারপর ভুলে যাবেন। আর টাকা তো নিজের বাবার কাছ থেকেই নিয়েছি, অন্য কারও কাছ থেকে তো চু*রি করিনি।”

ছেলেটার কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। আমি ছেলেটার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে চিনতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মনে পড়ল, এই ছেলেটাকে আমি আগে দেখেছি। আমি হাসিমুখে তাকে বললাম, “তুমি উত্তরপাড়ার রমিজ ভাইয়ের ছেলে না?”

আমার কথা শুনে ছেলেটা একটু থমকে গেল। সে সিগা**রেটটা হাত থেকে নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি আমার আব্বুকে চিনেন কিভাবে?”
আমি মৃদু হেসে বললাম, “তোমার আব্বুকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। বরং একটা কথা বলি, গতকাল রাতে তোমার বাবা চাল কেনার জন্য আমার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন।”

ছেলেটার মুখের হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব আস্তে করে বলল, “কত টাকা ধার নিয়েছিল?”
আমি বললাম, “আটশো টাকা।”

কথাটা শুনে ছেলেটা যেন হঠাৎ পাথরের মতো হয়ে গেল। তার হাতে থাকা সিগা**রেটের ছাই মাটিতে পড়ে গেল, কিন্তু সে সেদিকে কোনো খেয়ালই করল না। কিছুক্ষণ পর সে নিচু গলায় বলল, “সত্যি আমার আব্বু আপনার কাছ থেকে আটশো টাকা ধার নিয়েছিল?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, সত্যি। গতকাল রাত প্রায় দশটার দিকে তোমার বাবা আমার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তিনি অনেকক্ষণ কিছু না বলে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে আমি নিজে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘রমিজ ভাই, কোনো সমস্যা হয়েছে?’ তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই, ঘরে চাল নেই। বাচ্চাগুলো না খেয়ে থাকবে কালকে। হাতে কোনো টাকা নেই। কালকে রিকশা চালিয়ে টাকা পেলেই আপনাকে রাতে এসে দিয়ে দেব। আজকে শুধু আটশো টাকা যদি ধার দেন, তাহলে সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজার করতপ পারবো। একটা দিনের জন্য সংসারটা সামলে নিতে পারব।’”

ছেলেটা মাথা নিচু করে ফেলল। আমি তার দিকে তাকিয়ে আবার বললাম, “তোমার বাবা টাকা নেওয়ার সময় বারবার বলছিলেন, ‘ভাই, আপনার কাছ থেকে টাকা চাইতে আমার খুব লজ্জা লাগছে। কিন্তু ঘরে চাল না থাকলে তো আর আ*ত্মসম্মান দিয়ে সন্তানদের পেট ভরাতে পারব না।’ আমি তখন তাকে বলেছিলাম, ‘রমিজ ভাই, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজনের সময় মানুষ মানুষের কাছেই আসে।’”

ছেলেটা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার আব্বু আমাকে তো কিছু বলেনি কোনো দিন।”

আমি বললাম, “তোমার আব্বু তোমাকে কীভাবে বলবে? তুমি তো রাতেও বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে থাকো। তোমার বাবা তোমাদের জন্য চালের টাকা জোগাড় করতে মানুষের কাছে ধার চাইছিলেন।”

ছেলেটা আর কোনো কথা বলল না। তার বন্ধুটাও এতক্ষণে একেবারে চুপ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগেও যে দুজন নিজেদের বুদ্ধি নিয়ে হাসছিল, এখন দুজনের মুখেই কোনো কথা নেই।
আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, “তুমি জানো, তোমার বাবা গতকাল টাকা নেওয়ার আগে আমাকে কী বলেছিলেন?”

ছেলেটা মাথা নাড়ল।
আমি বললাম, “তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই, আমার ছেলে বড় হয়ে গেছে। ওকে কিছু বলতে পারি না। নিজের হাতে টাকা থাকলে হয়তো ওকে দিতে পারতাম, কিন্তু সংসারে এত খরচ যে সবসময় হাতে টাকা থাকে না।’ তোমার বাবা তোমার বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেননি। বরং তোমার কথা বলতে গিয়ে তার মুখে গর্ব ছিল।”
ছেলেটা এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।

আমি বললাম, “তোমার বাবা আমাকে আরও বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে হয়তো আমাকে এখন বুঝবে না। কিন্তু একদিন যখন নিজের সংসার হবে, তখন বুঝবে বাবার পকেট খালি থাকা কতটা কষ্টের।’”
ছেলেটা এবার নিজের চোখের পানি হাতের তালু দিয়ে মুছে ফেলল।

আমি তাকে বললাম, “তুমি হয়তো ভাবো, তোমার বাবা তোমাকে টাকা দিতে চান না। কিন্তু তুমি কি জানো, তোমার স্কুলের ফি দেওয়ার জন্য তোমার বাবা একবার টানা তিনদিন নিজের রিকশা চালানোর পরও দুপুরে ভাত খাননি? তুমি কি জানো, গত ঈদের সময় তোমার জন্য নতুন জুতা কেনার পর তিনি নিজের জন্য যে পাঞ্জাবিটা পছন্দ করেছিলেন, সেটা আর কেনেননি? তুমি কি জানো, তোমার ছোট বোনের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজের বাটন মোবাইল ফোনটা বিক্রি করে দিয়েছিলেন?”

ছেলেটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
সে বলল, “মোবাইলটা আব্বু বিক্রি করে দিয়েছিল?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ। তোমরা যখন ভাবছিলে তোমার বাবা মোবাইল হারিয়ে ফেলেছে।, তখন তিনি নিজের পুরোনো ফোনটা বিক্রি করে তোমার বোনের ওষুধ কিনেছিলেন।”

ছেলেটা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। আমি তাকে কাঁদতে দিলাম। কারণ কিছু কান্না মানুষকে দুর্বল করে না, বরং নিজের ভুলটা বুঝতে সাহায্য করে।
কিছুক্ষণ পর সে চোখ মুছে বলল, “চাচা, আমি জানতাম না এসব।”

আমি শান্তভাবে বললাম, “তুমি জানবে কীভাবে? তুমি তো বাবার হাতে টাকা দেখেছ, কিন্তু সেই টাকা উপার্জন করতে বাবাকে কত ঘণ্টা রোদে দাঁড়াতে হয়েছে, কত মানুষের কথা শুনতে হয়েছে, কতবার শরীর খারাপ নিয়েও রিকশা চালাতে হয়েছে, সেগুলো কখনো দেখোনি।”
ছেলেটা নিচু গলায় বলল, “আমি আরো টাকার জন্য আব্বুর ওপর রা*গ করতাম।”

আমি বললাম, “কেন?”
সে বলল, “আমার বন্ধুরা সবাই নতুন মোবাইল ব্যবহার করে, ভালো জামা পরে, বাইরে ঘুরতে যায়। আমি কিছু চাইলে আব্বু বলেন, টাকা নেই। তাই মনে হতো, আমার আব্বু হয়তো আমাকে ভালোবাসেন না।”

আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “যে বাবা নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে তোমার প্রয়োজন মেটায়, সে বাবা তোমাকে ভালোবাসে না, এটা কীভাবে ভাবলে? ভালোবাসা কি শুধু নতুন মোবাইল কিনে দেওয়ার নাম? তোমার বাবা তোমাকে হয়তো দামি ফোন দিতে পারেননি, কিন্তু তিনি তোমাকে নিজের র**ক্ত পানি করে মানুষ করছেন। তোমার বন্ধুরা তোমাকে একদিনের জন্য খাওয়াতে পারে, কিন্তু তুমি অসুস্থ হয়ে সারারাত কাঁদলে তোমার পাশে কে বসে থাকবে, সেটা ভেবে দেখেছ?”

ছেলেটা কোনো উত্তর দিল না।
আমি আবার বললাম, “আজ তুমি তোমার বাবার পকেট থেকে আটশো টাকা নিয়েছ। তোমার কাছে সেটা হয়তো শুধু আটশো টাকা। কিন্তু তোমার বাবার কাছে এই আটশো টাকা মানে তোমাদের ঘরের চাল, তোমার ছোট বোনের ওষুধ। তুমি টাকা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেতে চেয়েছিলে, অথচ তোমার বাবা সেই টাকা দিয়ে নিজের সন্তানদের পেট ভরানোর চিন্তা করছিলেন।”
ছেলেটা এবার উঠে দাঁড়াল। তার চোখ তখন লাল হয়ে আছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় যাচ্ছ?”
সে বলল, “বাড়ি যাচ্ছি।”
আমি বললাম, “কেন?”
সে বলল, “আব্বুর শার্ট টা বের করব। যে জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি, সেখান থেকে এনে টাকাটা আবার পকেটে রেখে দেব।”
আমি বললাম, “শুধু টাকা ফিরিয়ে দিলেই তোমার ভুলটা শেষ হবে না।”

সে আমার দিকে তাকাল।
আমি বললাম, “বাবার কাছে গিয়ে সত্যি কথাটা বলবে। তুমি টাকা নিয়েছিলে, সেটা স্বীকার করবে। তোমার বাবা যদি রা*গ করেন, তার রা*গ মেনে নেবে। তিনি যদি তোমাকে মা**রেন, তবুও মনে করবে তিনি তোমাকে ঘৃণা করেন না। কারণ সন্তানের ভুল দেখে বাবার রা**গের মধ্যেও ভালোবাসা থাকে।”

ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল, “চাচা, আব্বু আমাকে খুব মা** রবে।”

আমি বললাম, “হয়তো মা** রবে, হয়তো মা**রবে না। কিন্তু তোমার বাবা যখন জানবেন তুমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছ, তখন তার বুকটা গর্বে ভরে যাবে। মনে রেখো, বাবা সন্তানের ভুলে যতটা কষ্ট পান, সন্তান নিজের ভুল বুঝে ফিরে এলে তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হন।”

ছেলেটা চলে গেল।
সেদিন রাতে আমি অনেকক্ষণ দোকানে বসে ছিলাম। বারবার ছেলেটার কথাগুলো মনে পড়ছিল। ভাবছিলাম, একটা ছেলে বাবার পকেট থেকে আটশো টাকা চু**রি করেছে, কিন্তু সে জানেই না সেই আটশো টাকা বাবার কাছে কতটা মূল্যবান। আমাদের সমাজে এমন অনেক সন্তান আছে, যারা বাবার পকেটে থাকা টাকার হিসাব জানে, কিন্তু বাবার শরীরের ক্লান্তির হিসাব জানে না।

প্রায় এক মাস পর বিকেলে দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, রমিজ ভাই তার ছেলেকে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। রমিজ ভাইয়ের হাতে একটা ছোট ব্যাগ ছিল, আর ছেলেটার চেহারায় আগের সেই দুষ্টুমি নেই। তাকে দেখে মনে হলো, এক মাসের মধ্যেই ছেলেটা অনেক বড় হয়ে গেছে।

রমিজ ভাই আমার সামনে বসে বললেন, “ভাই, আপনার আটশো টাকা অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল। একটু দেরি হয়ে গেল, কিছু মনে করবেন না।”
আমি বললাম, “আরে রমিজ ভাই, এত চিন্তা করছেন কেন? দিলেই তো হয়।”
তিনি বললেন, “না ভাই, ধার থাকলে আমার ভালো লাগে না। তবে এবার টাকা দিতে আমার ছেলে সাহায্য করেছে।”

আমি অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকালাম।
রমিজ ভাই হেসে বললেন, “ও এখন বিকেলে আমার সঙ্গে রিকশার গ্যারেজে কাজ শেখে। নিজের খরচের জন্য আমার কাছে টাকা চায় না। বরং কয়েকদিন আগে নিজের প্রথম আয় থেকে আমার হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে বলেছে, ‘আব্বু, এতদিন তুমি আমার জন্য খরচ করেছ। এখন থেকে আমিও তোমার জন্য কিছু করতে চাই।’”

আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম।
ছেলেটা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, “চাচা, সেদিন আপনি আমাকে না বুঝালে আমি হয়তো কখনো বুঝতাম না।”(লেখক The Story Haven শাহেদ খান)
আমি বললাম, “আমি তোমাকে কিছু বুঝাইনি বাবা। শুধু তোমার বাবার গল্পটা তোমাকে বলেছিলাম। আসল শিক্ষা তোমার বাবা তোমাকে নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছেন।”

ছেলেটা তখন বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আব্বু, তুমি জানো, সেদিন তোমার শার্ট টা আমি খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম?”
রমিজ ভাই অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, জানি।”
ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল, “তুমি জানার পরও আমাকে কিছু বলোনি কেন?”

রমিজ ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। তারপর বললেন, “তুই আমার ছেলে। তুই ভুল করবি, আবার একদিন সেই ভুল বুঝবিও। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম, তুই কবে নিজে বুঝবি।”
ছেলেটা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
রমিজ ভাইও ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু তিনি সেটা লুকানোর কোনো চেষ্টা করলেন না।

আমি সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলাম।
সেদিন বুঝলাম, বাবা আসলে এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েন। সন্তান বাবার পকেট থেকে আটশো টাকা নিয়ে হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আনন্দ করতে পারে, কিন্তু বাবা সেই টাকা দিয়ে সন্তানের মুখে কয়েকদিনের খাবার তুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

বাবার পকেটের টাকা শেষ হয়ে যায়, বাবার জামা পুরোনো হয়ে যায়, বাবার জুতা ছিঁড়ে যায়, বাবার শরীর একদিন দুর্বল হয়ে যায়, কিন্তু সন্তানের জন্য বাবার চিন্তা কখনো শেষ হয় না।

তাই বাবার পকেট থেকে টাকা নেওয়ার আগে একবার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখবেন। সেই মুখে হয়তো আপনার জন্য হাজারটা না বলা গল্প লুকিয়ে আছে। হয়তো সেই পকেটের শেষ টাকাটাও আপনার জন্যই রাখা আছে।
আর যদি কোনোদিন দেখেন, বাবার পকেট সত্যিই খালি, তাহলে তাকে কিছু চাইবেন না। শুধু বাবার পাশে বসে তার হাতটা ধরে বলবেন, “আব্বু, এতদিন তুমি আমাদের জন্য করেছ। এবার থেকে তোমার জন্য কিছু করার সুযোগটা আমাকে দাও।”
কারণ বাবা জীবিত থাকতেই বাবার ভালোবাসার মূল্য বুঝতে হয়। বাবা চলে যাওয়ার পর তখন বুঝে আর লাভ নেই।

সমাপ্ত
শাহেদ খান

কেমন লাগলো বাবাকে নিয়ে লেখাটি?

Category

Telephone

Address


Cumilla

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Masud Rana Nehal posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Subscribe

We will notify you when anything happens in Cumilla.