Natural Touch

Natural Touch

Share

Organic products that made from Pure Aloevera...Try these for gaining a healthy skin....❣️❣️

16/09/2026

#মোহ_নেশা_ধামাকা_পর্ব
#লেখিকা_আরিশা_জান্নাত_রিয়া_পর্ব_৪৫

----আমাকে বিয়ে করবে মিস নবনী৷

নবনীতা যেনো কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো৷ এসব কি উদ্ভট কথা বলছে মাহির৷ নবনীতা মাহিরের দিকে একটু তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেললো৷ এসব কথা শুনার মতো কোনো ইচ্ছে নবনীতার নাই৷ সে কেমন শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,,,

---- আমাকে যেতে দিন৷

---- আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও৷

নবনীতা রাগী চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে কড়া কন্ঠে বলে উঠলো,,,

--- আপনাদের সবারি কি আমাকে হাসির পাএি মনে হচ্ছে৷ যে যেমন পারছেন মজা করে যাচ্ছেন আমার সাথে৷ আমি কি জোকার।

---- তোমার কেনো মনে হলো আমি তোমার সাথে মজা করছি৷

--- মজা নয়তো কি৷ আমি একজন বিবাহিত মেয়ে। আর আমার বিয়ে নিয়ে সবাই যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছেন তাতে মনে হচ্ছে আমি কোনো অবিবাহিত যুবতি মেয়ে৷

--- কথাটা বিবাহিত নয় বিধবা হবে৷ আর ঘরে যুবতি বিধবা মেয়ে থাকলে তার বিয়ের কথা সবাই চিন্তা করবে এটাই স্বাভাবিক৷

---- তাই বলে আপনিও সবার মতো এসব উদ্ভট কথা বলবেন৷

---- কোনটা তোমার কাছে উদ্ভট কথা মনে হচ্ছে নবনী৷ আমি তো কোনো উদ্ভট কথা বলি নাই তোমার সাথে৷ আমি সোজাসুজি তোমাকে প্রশ্ন করেছি আমাকে বিয়ে করবে নাকি৷ এতে খারাপের কিছু দেখছি না তো৷

নবনীতা রাগী চোখে তাকালো মাহিরের দিকে৷ তারপর কন্ঠে তেজ এনে বললো,,,

--- লজ্জা করে না নিজের বন্ধুর স্ত্রী কে এসব বাজে কথা বলতে৷ আমি তো আপনাকে ভালো মানুষ ভেবেছিলাম৷ কিন্তু আপনিও তো আর সবার মতো মজা নিতে ছাড়ছেন না৷

---- নবনী মুখ সামলে কথা বলো৷ আমি তোমার সাথে কোনো মজা করছি না৷ আই এ্যাম সিরিয়াস৷

---- আপনার কেনো আমাকেই বিয়ে করতে হবে৷ যেখানে আপনার জন্য পুরো গ্রাম থেকে শিরু করে অফিসের সব মেয়েরাই পাগল৷ সেখানে আপনি কেনো আমার মতো বিধবা অসুন্দর মেয়ে বিয়ে করতে চাচ্ছেন৷ কি উদ্দেশ্য আপনার৷

---- আমার একটাই উদ্দেশ্য, সেটা হলো তোমাকে নিজের করে পাওয়া৷

--- আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে মাহির৷ আপনি কি সব উল্টা পাল্টা কথা বলছেন৷ আপনি ভূলে গেছেন আমি সাহিলের স্ত্রী৷ আমি আর কখনো কাউকে বিয়ে করতে চাই না৷আর যদিও কখনো বিয়ে করি সেই মানুষটা আপনি হবেন না সেটা নিশ্চিত থাকুন৷

মাহিরের ভ্রু কুঁচকে গেলো মূহুর্তের মধ্যে৷ নবনীতা বিয়ে করলেও তাকে করবে না এই কথাটা যেনো সে হজম করতে পারলো না৷ মাহির কেমন ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টিতে নবনীতার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,,,

---- কেনো আমাকে বিয়ে করলে কি সমস্যা৷ আমি কি তোমার যগ্য নই৷ নাকি আমাকে তোমার সাথে মানাবেনা৷

----- কারণ আপনার চরিএের ঠিক নাই৷ যে মানুষ নিজের বন্ধুর স্ত্রীর দিকে খারাপ নজর দিতে পারে, আর যাই হোক তাকে আমি ভালো মানুষ বলতে পারছি না৷

মাহির স্তব্ধ হয়ে তাকালো নবনীতার দিকে৷এটা কি বললো নবনীতা,মাহির তার দিকে খারাপ নজর দিয়েছে৷ মাহিরের কেমন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো৷ যাকে এতোগুলো বছর পবিত্র নজরে দেখে এসেছে আজ সেই কিনা বলছে তার নজর খারাপ৷ মাহির যেনো এই কথাগুলো মানতে পারছে না৷ রাগে তার শরীর কেমন জ্বলে উঠলো। এতোক্ষণের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে সে নবনীতার কোমড় ধরে কাছে টেনে এনে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিলো।হঠাৎ এমন আক্রমণে নবনীতা ভাষা হারালো৷ যতক্ষণে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে নিবে ততক্ষণে মাহির নবনীতাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে ফেলেছে৷ দুজন যেনো দুজনের শরীরের হার্টবিট শুনতে পাচ্ছে৷ এতো কড়া পারফিউমের ঘ্রাণে নবনীতার নাক জ্বলে উঠলো। সে মাহিরের হাত তার শরীর থেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে লাগলো৷ কিন্তু মাহির যেনো আজ রাগে জেদে অন্ধ হয়ে গেছে৷ নবনীতা যতই ছাড়াতে চাচ্ছে মাহির ততই হাতের জোর বাড়াচ্ছে৷ নবনীতা ব্যাথায় কেমন কুকড়িয়ে উঠলো। কন্ঠে সমস্ত রাগ ঢেলে নবনীতা বলে উঠলো,,,

---- আপনি কিন্তু অসভ্যতা করছেন মাহির ভাই৷

---- কিছু না করেই যখন কেউ খারাপ মানুষের তকমা পায়, তখন কি তার উচিত না সেই কাজ গুলো করে তকমা নেওয়া ৷

--- বখাটেদের মতো কথা বলবেন না মাহির ভাই৷ এই কথাগুলো শুভ্র ভাই বললে মানা যেতো। আপনার মুখে এসব বড্ড বেমানান৷

মাহির নবনীর শাড়ি ভেদ করে এবার কোমড় স্পর্শ করলো। নবনীতার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো যেনো৷ এতক্ষণ শাড়ির উপর দিয়ে হাত দেওয়ার কারণে খুব বেশি অসস্তি লাগেনি৷ কিন্তু এবার মাহির সরাসরি নবনীতার কোমড়ে হাত রেখেছে৷ নবনীতা পেটের মধ্যে মোচার দিয়ে উঠলো৷ সাহিল মারা যাওয়ার এতোগুলো মাস পড়ে আবার সেই অদ্ভুত শিরশির করা অনুভূতি। নবনীতা দাঁতের সাথে দাঁত চেপে ধরে মিনমিন করে বললো,,,

---- আমার অসস্তি লাগছে মাহির ভাই। ছেড়ে দিন আমাকে৷।।

--- যদি না ছাড়ি৷

নবনীতা কোনো কথা বললো না৷ চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো৷ অদ্ভুত অনুভূতি তাকে আষ্টে পিষ্টে জরিয়ে ধরেছে। এমন কেনো হচ্ছে তার সাথে৷ মাহির যেনো আরো একটু সাহস করে বসলো৷ সে নবনীতার কোমড়ে হালকা স্লাইড করতে লাগলো ৷ নবনীতার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো মাহিরের ঠান্ডা খড়খড়ে হাতের স্পর্শে৷ মাহিরের একটা হাত আপনা আপনি নবনীতার ঘাড়ের পিছনে চলে গেলো৷ নবনীতা চমকে উঠলো মাহিরের কাজে৷ মাহির কি করতে চাচ্ছে ঘটনা আচ করতে পেরে নবনীতা কেমন সিটিয়ে গেলো৷ দেওয়ালের দিকে কেমন চেপে যেতে লাগলো সে৷পেটের মধ্যে গুরগুর করতে লাগলো নবনীতার ৷ ততক্ষণে মাহির নিজের মুখটা নবনীতার খুব কাছে নিয়ে গেছে৷ মাহিরের ঠোঁট ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে নবনীতার ঠোঁটের দিকে৷ নবনীতা ভয়ার্ত চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে সরে যেতে নিলেই মাহির নবনীতার কোমড়ের পিছন দিয়ে হাত দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে আসলো নিজের কাছে৷ যেই না মাহিরের ঠোঁট নবনীতার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিবে অমনি নবনীতা মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ালের সাথে লাগে গেলো৷ মাহিরের ঠোঁট গিয়ে ঠেকলো নবনীতার গলায়৷ নবনীতার কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে৷ মেয়েদের সেনসিটিভ জায়গার মধ্যে গলা,ঘাড় সবার আগে৷ এখানে স্পর্শ করলে যে কেনো মেয়ে মূহুর্তের মধ্যে কাবু হয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু মাহির কিছু করলো না হালকা একটা চুমু দিয়ে সরিয়ে আনলো নিজের মুখ৷ নবনীতার চোখে পানি টলমল করছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো৷ সে কেনো হঠাৎ করে এতটা নরম হয়ে গেলো৷ সে শক্ত হলে মাহির নিশ্চয়ই কিছু করতে পারতো না তার সাথে৷ হঠাৎ করে নবনীতা কেমন ফুঁপিয়ে উঠলো। নবনীতা কে কান্না করতে দেখে মাহির নিজের ঘোর থেকে বেড়িয়ে এলো৷ এক মূহুর্ত নিজেদের দিকে তাকিয়ে ছিটকে সরে গেলো সে৷ নবনীতা ঠোঁট কামড়ে কান্না করছে৷ সাহিল কে কি জবাব দিবে সে৷ সে তো অপবিত্র হয়ে গেলো৷ নবনীতা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো এবার৷ মাহিরের নিজের করা কাজে নিজেকেই ছোট মনে হচ্ছে৷ হঠাৎ করে কি হয়ে গেলো তার৷ ওফ মাহির রেগে দেওয়ালে জোরে ঘুসি মেরে বিরবির করে বললো,,,

---ওহ শিট শিট এটা কি করে বসলাম আমি৷ নবনী কি ভাবলো আমাকে৷ ও তো আমার সাথে কথাই বলবে না আর৷ ওহ গড এমন একটা ব্লান্ডার কি করে করলাম আমি।

এদিকে মাহিরের দেওয়ালে ঘুসি দেওয়ায় নবনীতা হতভম্ব চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে৷ ঠোঁট কামড়ে যেনো কান্না আটকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ক্রমাগত। যার জন্য কেমন ফোঁপানের শব্দ বের হচ্ছে। নবনীতার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে সে অপবিত্র হয়ে গেছে৷ সাহিলের ছবির সামনে কিভাবে দাড়াবে সে৷ এদিকে মাহির যেনো নবনীতার মনের কথা বুঝতে পারলো৷ সে এবার একটু সাহস করে নবনীতার মুখটা দুই হাতের আজলায় নিয়ে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিলো৷ তারপর নবনীতা কে বুঝানোর মতো করে বললো,,

---- একদম গিল্টি ফিল করবে না নবনী৷ তুমি আগে যতটা পবিত্র ছিলে এখনো ঠিক ততটাই পবিত্র আছো৷ বিশ্বাস করো৷

নবনীতা কাঁদতে কাঁদতে বললো,,,

---- আপনি আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছেন মাহির৷ তার পড়েও বলছেন আমি পবিত্র আছি৷ কিভাবে বলতে পারছেন এমন কথা৷ আমি সাহিলের কাছে কি জবাব দিবো৷ কেমন করে ওর ছবির সামনে দাড়াবো আমি, আপনি বলে দিন আমাকে৷

মাহির আবার নবনীতার চোখ মুছে দিলো৷ তারপর নবনীতার মুখটা ধরে একদম নিজের কাছে নিয়ে এসে শান্ত কন্ঠে বললো,,,

---- ভালবাসা কখনো অপবিত্র হয় না নবনী৷ আমি আমার সমস্ত ভালবাসা দিয়ে তোমাকে স্পর্শ করেছি৷ এটা কখনো অপবিত্র হতে পারে না৷

---আপনি কাজটি মোটেও ঠিক করেননি মাহির৷ আমাকে এভাবে স্পর্শ করার আপনার কেনো অধিকার নাই৷ আমি নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না৷ নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে আমার৷

--- হুশ, আমি বলেছি না আমার স্পর্শ পবিত্র৷ একবার কেনো, বারবার স্পর্শ করলেও আমার ছোঁয়া তোমার জন্য পবিত্রই থাকবে৷

নবনীতা অবাক হয়ে বললো,,

--- মানে কি বলতে চাচ্ছেন আপনি৷

মাহির নবনীতার মুখটার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো৷ তারপর কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো,,,

--- এখন আপাতত কিছু বলতে চাচ্ছি না৷ যাও ফ্রেস হয়ে আসো ওয়াশরুম থেকে। আমি আছি এখানে৷

নবনীতা ফুঁপিয়ে উঠে বললো,,

---- আপনি আবার স্পর্শ করেছেন আমাকে।

মাহির কেমন করে তাকিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,,,

---- বলেছিনা পবিত্র স্পর্শ৷ যাকে এক কথায় বলে হালাল স্পর্শ৷

নবনীতার বুকের মধ্যে ধুক করে উঠলো৷ হালাল স্পর্শ। বিয়ে ছাড়া পরপুরুষের স্পর্শ হালাল হয় কিভাবে৷ নবনীতা আর ভাবতে পারলো না৷ আজকের দিনটা যেনো তার জীবনে শনি৷ এতো খারাপ দিন সে আগে কখনো পার করেনি৷ নবনীতা ওয়াশরুম যেতে যেতে চিন্তা করলো সে চাকরিটা ছেড়ে দিবে৷ মাহিরের আশে পাশে থাকাটা তার জন্য খুবই বিপদজনক৷ আর আজকের পড় থেকে তো মাহিরের সামনেই আসা উচিত না তার৷ কি কান্ড করলো মাহির৷ ছি, ছি সে আয়নার সামনে দাড়াবে কিভাবে৷ যদিও তাদের মধ্যে কোনো কিছুই হয়নি৷ তবুও মাহির তো তার কোমড় স্পর্শ করেছে৷ মাহিরের ঠোঁট তার গলা কপাল স্পর্শ করেছে৷ এটাও বা কম কিসে। মাহির তো তার জন্য পরপুরুষ৷ আর পরপুরুষ হাত ধরা মানেই অনেক কিছু৷ লোকে জানলে তো ছি,ছি করবে৷ নবনীতা ওয়াশরুম ঢুকে দরজা শব্দ করে আটকে দিলো৷ তারপর আয়নার সামনে দাড়িয়ে অঝরে কাঁদতে শুরু করলো৷ কেনো সে এক মূহুর্তের জন্য মাহিরের প্রতি নরম হলো৷ কেনো সে মাহির কে থাপ্পড় মেরে সরিয়ে দিতে পারলো না৷ নবনীতা ভূল করে ফেলেছে৷ যদিও সে আটকাতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি৷ কিন্তু নবনীতার মতে তার আরো বেশি কঠোর হওয়া উচিত ছিলো৷ এর পড় থেকে সে নিজের ভূল সুধরে নিবে৷ নিজেকে আরো পাথরের মতো উপস্থাপন করবে সে৷ না হলে মাহির তার পিছু ছাড়বে না৷মাহিরের চোখে মুখে তাকে পাওয়ার আকুতি সে দেখতে পেয়েছে৷ এই আকুতি নিছক দুষ্টুমি বা মজা করার নয়৷ মাহিরের প্রতিটা হৃদস্পন্দন জানান দিয়েছে সে সত্যি নবনীতাকে কতটা চায়৷ এতোকিছু বুঝার পড়েও নবনীতা কিছুতেই মাহিরের আশে পাশে থাকবে না৷ সে কালকেই চাকরি ছেড়ে দিবে৷ যাবেনা আর মাহিরের সামনে৷ দেখা না হলে নিশ্চয়ই মাহির কিছু বলতে বা করতে পারবে না৷ বাড়িতে এসে নিশ্চয়ই এসব কান্ড করবে না মাহির৷
-------------------
তুয়া আর আযানের এঙ্গেজমেন্ট হয়ে গেছে। তারপর সকলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে চলে গেছে৷ নবনীতা কিছুই খেতে পারেনি৷ তার সারা শরীর মৃদু ভাবে কাঁপছে৷ বারবার মাহির স্পর্শের কথা মনে পড়ছে তার৷ যতবারি চোখের সামনে সেসব আসছে ততবার নবনীতার শরীর ঝংকার দিয়ে কেঁপে উঠছে৷ তালুকদার বাড়ির সবাই চলে গেছে শুধু শুভ্র যায়নি৷ বউয়ের সাথে একটা কথাও বলতে পারলো না আর এখনি সে চলে যাবে৷ কখনো না৷ রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে৷ সবাই শুয়ে পড়েছে শুভ্র বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে আছে৷ মোহ ড্রেস চেঞ্জ করে এসে দেখে শুভ্র শুয়ে আছে৷ দরজা শুভ্রই লক করেছে৷ মোহ ধীর পায়ে হেটে এসে শুভ্রের কাছে দাড়ালো৷ তারপর মিনমিনে কন্ঠে বলে উঠলো,,,

---ফ্রেস হয়ে আসুন শুভ্র ভাই৷

শুভ্র কেমন তীক্ষ্ণ চোখে মোহর দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগ নিয়ে বলে উঠলো,,,

---- ভাই ভাই বলা বন্ধ কর৷ হাফ বাসর হয়ে গেছে। ফুল বাসর হলে বাচ্চা পয়দা হয়ে যাবে। এখনও ভাই বলছিস লজ্জা করছে না বেয়াদব৷

মোহর কান দিয়ে যেনো ধোঁয়া বের হতে লাগলো৷ এ কেমন ধরণের কথা৷ ছি এই লোকটা ভাষা কি জীবনে ঠিক হবে না৷ মোহর লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে৷সে সরে যেতে চাইলো শুভ্রের কাছ থেকে। কিন্তু শুভ্র হঠাৎ উঠে বসে মোহর হাত ধরে টান দিয়ে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিলো৷ তারপর রাগী কন্ঠে বলে উঠলো,,,

---- তোকে না বলেছিলাম সাজগোজ না করতে৷ কোন সাহসে সেজেছিস তুই বেয়াদব৷

মোহ শুভ্রের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো,,,

--- চোখে বেশি দেখন আপনি৷ কই সেজেছি আমি৷ নতুন ড্রেস ও কি পড়তে পারবো না৷

---- ড্রেস পড়েছিস ভালো কথা। কিন্তু ঠোঁটে এসব কি লাগিয়েছিস । এই যে কেমন চিকচিক করছে ঠোঁট৷

শুভ্র মোহর ঠোঁটে স্পর্শ করে দেখাতে লাগলো৷ হঠাৎ শুভ্রের কান্ডে মোহ খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে বলে উঠলো,,,

--- কি করছেন, ডলছেন কেনো ঠোঁট।

---- এসব কি দিয়েছিস ঠোঁটে৷ এমন আকর্শনীয় লাগছে কেনো। খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার৷

মোহ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে উঠলো,,,

*-- যান ফ্রেস হয়ে আসুন৷ ঘুমাবো আমি ক্লান্ত লাগছে৷

----স্বামী কাছে থাকলে কেউ ঘুমায়৷

--- তো কি করে।

---- রোমান্স করে মোহরানি৷ রোমান্স করে৷

--- এসব ছাড়া মাথায় আর কিছু আসে না৷

---- উহু, বিয়ের পড়ে রোমান্স ছাড়া মাথায় কিছু আসে৷

মোহ বিরক্ত হয়ে উঠে দাড়ালো তারপর কড়া কন্ঠে বলে উঠলো,,,

---- ইচ্ছে হলে ফ্রেস হন। না হলে এমনি ঘুমান৷ আমি গেলাম৷

শুভ্র সাথে সাথে সটাং হয়ে বসে পড়লো৷ তারপর ভ্রু কুঁচকে মোহর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,,,

--- কই যাবি৷

--- অন্য রুমে৷

---- কেনো৷

--- কারণ এখানে থাকলে আমার ঘুম আসবে না৷ আপনি থাকুন আপনার উদ্ভট চিন্তা নিয়ে আমি গেলাম৷

মোহ দরজার দিকে এগুতে নিলে শুভ্র ফট করে দাড়িয়ে মোহকে কোলে তুলে নিলো৷ মোহ চিৎকার করতে গিয়েও করলো না৷ শুভ্র মোহকে প্রায় বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে বললো,,

---- বেশি তেজ বাড়ছে তাই না৷ তেজ কিভাবে কমাতে হয় সেটা কিন্তু শুভ্র ভালোই জানে৷

---- ঘুমাতে দিচ্ছেন না তো কি করবো ।

শুভ্র শার্ট খুলতে খুলতে বললো,,,

---- কে বলেছে ঘুমাতে দিবো না৷

--- আ,আপনি শার্ট খুলছেন কেনো৷

---- তো আমাকে কি মেয়ে মানুষের মতো ড্রেস পড়েই ঘুমাতে বলছিস নাকি৷

--- পড়ে থাকুন সমস্যা কি৷

--- অনেক সমস্যা। কাছে আয়৷

--- কে,,কেনো৷

---- কেনো আবার তোর সাথে ইন্টু পিন্টু করবো৷

---- ইন্টু পিন্টু আবার কি৷

---- আয় করে দেখাই৷

শুভ্র মোহকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো৷ মোহ নড়াচড়া করতে চাইলেই শুভ্র ধমক দিয়ে বললো,,,

----বেশি বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু শুরু করে দিবো৷

---- কি,,

---- বাপ হওয়ার প্রসেসিং।

চলবে,,,,,
(এতো বড় লিখি তাও শেয়ার করে সাহায্য করেন না৷ আপনাদের কপালে এমন রোম্যান্টিক জামাই বউ জুটবে না৷ বলে রাখলাম। ধামাকা পর্ব চাইলে শেয়ার করে দিবেন।)

16/09/2026

২৩.(শেষাংশ)‘এক্সকিউজ মি ভাইয়া, এক কেজি রসমালাই, এক কেজি স্পঞ্জ রসগোল্লা, এক কেজি মতিচুর লাড্ডু, এক কেজি কাজু বরফি, আর এক কেজি কালোজাম মতো ওই যে ক্রিম দেওয়া ঐটা দ্রুত প্যাক করে দিন।’
অর্নার এমন অর্ডারের লিস্ট শুনে ‘মিঠাই’-এর স্টাফ দুইজন একে অপরের মুখের দিকে হা করে চাওয়া-চাওয়ি করে। গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো, পরনে স্বনামধন্য কলেজের ড্রেস পরিহিত একটা মেয়ে একা দোকানে এসে এত হরেক পদের দামি মিষ্টির অর্ডার দিচ্ছে! এ যেন বড্ড অদ্ভুত আর অস্বাভাবিক ব্যাপার! সাধারণ কোনো ক্রেতা হলে হয়তো একটু চিন্তাভাবনা করত, কিন্তু মেয়েটির চোখ-মুখে ইতস্তত বা দ্বিধার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই।অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়া এভাবে মিষ্টি কেনে না। তবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে তারা আর বেশি প্রশ্ন বাড়াল না। দ্রুত কাচের শো-কেস থেকে একে একে টাটকা মিষ্টিগুলো বের করে ফয়েল মোড়ানো বক্সে সাজাতে শুরু করল। দেখতে দেখতে পাঁচ-পাঁচ কেজি মিষ্টির সারিবদ্ধ রঙিন প্যাকেট কাউন্টারে জমা হলো।

সেগুলোর বিল রেডি করতে করতে দুইজনের মধ্যে একজন স্টাফ কৌতুহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
‘অপুকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসছে নাকি? তাই এত মিষ্টির আয়োজন?’

অর্না খিলখিল করে হেসে উঠে জবাব দেয়,
‘আরে না ভাইয়া! ছেলেপক্ষ কেন দেখতে আসবে? আমি নিজেই ছেলে দেখতে যাব। বেচারা অসুস্থ তো! জ্বরমুখে নাকি আবার মিষ্টি ছাড়া কিছুই খেতে পছন্দ করে না, তাই এই সামান্য আয়োজন...’

স্টাফ দুইজন যেন আকাশ থেকে পড়ল! অবাক চোখে তাকিয়ে দ্বিতীয় স্টাফটি বলে উঠল,
‘এটা সামান্য নয় ম্যাডাম, অসামান্য! যাই হোক, আপনার মোট বিল এসেছে ৩১৪০ টাকা।’
অর্না দেরি না করে নিজের কলেজ ব্যাগে থাকা ছোট একটা সুন্দর লেদার ব্যাগ থেকে চকচকে এক হাজার টাকার চারটা নোট বের করে কাউন্টারে এগিয়ে দিল। স্টাফ ছেলেটাও টাকাটা হাতে নিয়ে বিলিং কম্পিউটারে দ্রুত হাত চালালো।

আসলে টাকা নিয়ে অর্নাকে কখনো ভাবতে হয় না, কিংবা হিসাব কষতেও হয় না। তার নিজের কাছে সবসময়ই যথেষ্ট পরিমাণ টাকা থাকে। মাসের শুরুতে অনিক আর তার বাবা মশিউর রহমান সাহেব মিলে ভালো একটা মোটা অংকের টাকা তার অ্যাকাউন্টে দিয়ে থাকেন হাত খরচের জন্য। হিসেব করে দেখলে দেখা যায়, একটা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পুরো মাসের সংসার খরচ অর্নাকে একবারে শুধু এক মাসের হাত খরচের জন্যই দেওয়া হয়! তবে অর্না সে টাকার বেশিরভাগটাই রেখে দেয়, না হয় ব্যাংকে জমা রাখে। অনর্থক বেহিসাবি খরচ বা অপচয় সে মোটেই পছন্দ করে না। ঠিক যতটুকু তার প্রয়োজন, ততটুকুই সে খরচ করে। অনেক সময় সেইটুকুও নিজে করার প্রয়োজন পড়ে না।অনিক কিংবা তার বাবা মশিউর রহমান সাহেব আগেই তা এনে হাজির করেন।

কম্পিউটারে বিল পে করে অর্না বাকি ফেরত পাওয়া ৮৬০ টাকাটা ব্যাগে পুরে নিল। এরপর ভারী মিষ্টির প্যাকেটগুলো নিজে একবারে তুলতে গেলে একজন স্টাফ দ্রুত এগিয়ে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে,
‘আপনি একা এতগুলো ভারী ব্যাগ সামলাতে পারবেন না ম্যাডাম। চলুন, আমি দুটো ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে আসছি আপনার সাথে।’

অর্না আর মানা করল না। স্টাফটি সবকটি ব্যাগ যত্ন করে তুলে নিয়ে অর্নার পিছু পিছু বাইরে বেরিয়ে এল। দোকানের সামনেই পার্ক করা ছিল অর্নার চকচকে স্কুটিটি। স্টাফ ছেলেটি স্কুটির সামনের হুক আর পেছনের ক্যারিয়ারে খুব সাবধানে ব্যাগগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে ভেতরে চলে গেল।
ঝলমলে দুপুরের তীব্র রোদের মাঝে অর্না মাথায় হেলমেটটা গলিয়ে স্ট্র্যাপটা আটকে নিল। বাইকের চাবিটা ইগনিশনে ঘোরাতে যাবে, ঠিক তখনই তার মগজের কোণে বিদ্যুৎ চমকের মতো ভেসে উঠল একটা বিশেষ মুখ—‘নিহাল’!
মুহূর্তের জন্য সময়ের চাকা যেন থমকে গেল। অর্নার শরীর জুড়ে এক অদ্ভূত অসাড়তা নেমে এল, শক্ত হয়ে এল স্কুটির হ্যান্ডেল ধরে রাখা দুই হাত। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক বেগে তোলপাড় শুরু করল, যেন পিঞ্জর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। নিহাল নামটার সাথে জড়িয়ে থাকা তীব্র অনুভূতির জটিল সমীকরণগুলো নিমেষেই তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে চাইল।
কিন্তু অর্না নিজেকে সামলাতে সময় নিল না। জোর করে একটা তীব্র ও গভীর শ্বাস টেনে নিল সে। বুকের ভেতর জমা হওয়া সব অস্থিরতা এক ঝটকায় সাইড করে দিল। এখন দুর্বল হওয়ার সময় নয়, তাকে পৌঁছাতে হবে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে।
চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে খুলে, পূর্ণ শক্তিতে এক মোচড়ে স্কুটি স্টার্ট দিল অর্না। ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জন তুলে স্কুটি ছোটাল সামনের দিকে। তার গন্তব্য এখন ‘Rizwan’S Palace’।

-
আফরোজা বেগম নিহালের জন্য ট্রেতে কিছুটা গরম চিকেন স্যুপ আর কফি রেডি করছিলেন। ঠিক তখনই কোনো কারণ ছাড়াই তিরিং-বিরিং করে নাচতে নাচতে কিচেনের দরজায় হাজির হলো নাবিল। ছোট ছেলের এই উদ্ভট লাফালাফি দেখে আফরোজা বেগম কপাল সামান্য কুঁচকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন। তারপর ভ্রূ নাচিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
‘এভাবে লাফাচ্ছিস কেন? পশ্চাৎদেশে থাকা বাঁদরের হাড়টা কি নতুন করে খোঁচা দিচ্ছে নাকি?’
আফরোজা বেগমের মোক্ষম বাণে নাবিলের উজ্জ্বল, হাসি-হাসি মুখটা নিমেষেই অন্ধকার হয়ে গেল। সে ঝটপট সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর গাম্ভীর্য ফুটিয়ে মায়ের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মেকি রাগী গলায় বলল,
‘চিন্তা করা যায়! নিজের বাড়িতে, নিজেরই গর্ভধারিণী মায়ের কাছে একজন অতি সুদর্শন যুবককে এভাবে রোস্ট হতে হয়! আম্মু, আমার আত্মসম্মান কোথায় গিয়ে ঠেকছে বলো তো? কোথায় আমার সম্মান!! কোথায়!!’

আফরোজা বেগম কফির মগের ওপর ঢাকনাটা বসাতে বসাতে বিন্দুমাত্র না ভেবে উত্তর দিলেন,
‘মঙ্গল গ্রহে।’

মায়ের এক লাইনের শর্ট-সার্কিট জবাবে নাবিলের মুখটা হাওয়া ছাড়া বেলুনের মতো এক লহমায় চুপসে গেল। সে একদম হাতজোড় করার ভঙ্গিতে মুখটা কাঁদো-কাঁদো করে বলল,
‘আম্মু, এটা কিন্তু একদম ঠিক হচ্ছে না। কতখানি আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে একটা দারুণ সুখবর দিতে আসলাম, আর তুমি...’
আফরোজা বেগম ট্রেতে চামচটা ঠিকঠাক গুছিয়ে রেখে নাবিলের দিকে ঘুরে তাকালেন। মুখে হালকা একচিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
‘আচ্ছা, শুনছি। বলেন তো বাঁদরের মহারাজা, কী সেই মহা খুশির খবর?’

‘আম্মুউউউউউউ...!’

ছোট ছেলের এমন ভেবাচেকা খাওয়া রাগ দেখে আফরোজা বেগম আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। খিলখিল করে হেসে উঠলেন তিনি। তারপর নাবিলের বাহুতে আলতো করে আদরমাখা চাপড় দিয়ে নরম গলায় বললেন,
‘আচ্ছা বাবা, ভুল হয়ে গেছে। এবার বলো তো আমার ছোট রাজপুত্রের কী এমন মহা সুখবর?’
মায়ের কথায় নাবিলের ঠোঁটের কোণে আবারও আগের সেই শয়তানি হাসিটা চওড়া হয়ে ফুটল। ক্ষণিকের রাগ ভুলে পুনরায় উৎফুল্ল হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘অর্না আসছে তোমার বড় ছেলেকে দেখতে!’

আফরোজা বেগম খানিকটা চমকে উঠলেন। কফির মগ থেকে চোখ তুলে বিস্ময় নিয়ে শুধালেন,
‘কী বলছিস? অর্না আসছে? কখন?’

‘এই তো, এলো বলে! তবে শুধু আসছে না, তোমার প্রিয় বড় ছেলের জন্য মিষ্টি কিনে নিয়ে আসছে।’
নাবিলের কথাটা শুনে আফরোজা বেগম পুরো থ বনে গেলেন। ছেলেটা বলে কী!
‘কী ভুলভাল বকছিস নাবিল? মিষ্টি মানে? নিহাল এই জ্বরের মুখে মিষ্টির নাম শুনলেই তো রেগে আগুন হয়ে যাবে! তুই অর্নাকে এসব হাবিজাবি ইনফরমেশন কেন দিতে গেলি?’

নাবিল কোনো অপরাধবোধ না দেখিয়ে উল্টো এগিয়ে এসে আফরোজা বেগমের কাঁধ চেপে ধরল। দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
‘জাস্ট চিইইইইললল,নিহাল ভাই না খেলে কী হয়েছে? সব তো আর ফেলনা যাবে না, সোজা আমার পেটে চালান হবে!’
আফরোজা বেগম ঘাড় ঘুরিয়ে নাবিলের গালটা আদর করে একটু টেনে দিয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘ঘটনা কী বল তো? এত খাতির কিসের?’

নাবিল এক চোখ টিপে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
‘কাহিনী তো হে মাগার সামাঝ নেহি আ রাহা! আজ ভেতরে যাক, তারপর কিছুটা বুঝে তোমাকে সব রিপোর্ট দেব। তবে...’
‘তবে কী?’
‘অর্না যদি আমাদের এই বাড়ির বড় বউ হয়ে আসে, মানে আমার ভাবি হয়... খুব একটা মন্দ হয় না, তাই না আম্মু?’
নাবিলের এই প্রচ্ছন্ন গোয়েন্দাগিরি শুনে আফরোজা বেগম এবার ঠোঁটে হাত চাপা দিয়ে মুচকি হেসে উঠলেন। বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
‘ও মা! তুই এসব কেবল আজ জানলি?’
নাবিল এক ঝটকায় আফরোজা বেগমের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিল। কয়েক পা পিছিয়ে এসে একদম গোয়েন্দাদের মতো চরম সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
‘আজ জানলি মানে?! কী বলছ আম্মু? ওদের মধ্যে কোনো চালু কাহিনী...’
নাবিলের কথাটা শেষ করার আর কোনো প্রয়োজনই পড়ল না। আফরোজা বেগম স্মিত হেসে অতি শান্ত ভঙ্গিতে উপর-নিচ মাথা নাড়ালেন, যার পরিষ্কার অর্থ হ্যাঁ, তুই যা ভাবছিস তা বহু আগে থেকেই সত্যি!
দৃশ্যটা দেখে নাবিল দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ধপাস করে কিচেনের মেঝেতেই বসে পড়ল। তার চোখ দুটি তখন বিস্ময়ে কপালে ওঠার জোগাড়! ছোট ছেলের এমন পুরোপুরি হতভম্ব রূপ দেখে আফরোজা বেগম আর সময় নষ্ট করলেন না। হালকা হেসে স্যুপ আর কফির ট্রে-টা যত্ন করে হাতে তুলে নিয়ে বড় ছেলের ঘরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলেন।
আর নাবিল কিচেনের ঠাণ্ডা মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসে রইল। তারপর নিজের কপালে নিজে হাত ঠুকে আপন মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
‘এ তো দেখি প্রবাদ বাক্যের মতো একেবারে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! কিসব সাংঘাতিক মানুষের সাথে এক ছাদের নিচে থাকি আমি! আজ বুঝতে পারছি, এরা সুযোগ পেলে গোপনে আমাকে পর্যন্ত হাটে বেচে দেবে, আর আমি টেরও পাব না!’

-
নিহালদের বাড়ির গেটের ঠিক সামনে এসে স্কুটিটা থামাতেই অর্ণার বুকের ভেতরটা আবারও অদ্ভুতভাবে ধক করে উঠল।লোহার বড় গেটের বাইরে দারোয়ান চাচা চা খাচ্ছে।এই দুপুর বেলা গরমে চা খেতে দেখে অর্নার নিজেরই কেমন গরম লাগতে শুরু করল।বাড়িটার দিকে এক ঝলক তাকালো।আধুনিক ট্রিপ্লেক্স বাড়ি,বাইরেটা পুরো সাদা আর ধূসর রংয়ের কম্বিনেশন করে রং করা।এই বাড়ি নতুন করার পর অর্না প্রথম এসেছিল আর আজকে।কিন্তু আজকের এই দুপুরটার অনুভূতি সম্পূর্ণ অন্যরকম, বড্ড আলাদা। আজ সে খুব ভালো করেই জানে—ঐ বিশাল বাড়িটারই কোনো একটা ঘরে চুপচাপ শুয়ে আছে তার কাঙ্খিত মানুষটা। সে অসুস্থ, গা-পোড়ানো তীব্র জ্বরে হয়ত ছটফট করছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই অর্ণার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এক অজানা আশঙ্কায় তার দম আটকে আসতে চাইল।
নিজেকে সামলে নিয়ে স্কুটিটা নিয়ে গেলো অর্ণা। অর্না গেটের সামনে এসে থামতেই দারোয়ান তাকে প্রশ্ন করে,
‘কে? কাকে চাই?’

অর্না হেলমেটের সামনে গ্লাস তুলে হাস্যোজ্বল মুখে সালাম দিয়ে বলল,
‘ চাচা আমি অর্না।’

দারোয়ান কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করেই চিনতে পেরেই বলে উঠল,
‘ আম্মা জান যাও।তোমার আব্বা মা,ভাই সকলে ভালো আছে?’

প্রশ্নটা করতে করতে দারোয়ান চাচা গেট খুলে দিলেন।অর্না স্কুটি স্টার্ট দিয়ে বলল,
‘ সবাই ভালো আছে চাচা।’

‘ আচ্ছা আম্মা যাও।’

স্কুটি এসে থামলো বাড়ির মূল ফটকের সামনে।স্কুটি থেকে নেমে কলেজ ব্যাগটা কাঁধে ভালো করে ঝুলিয়ে নিয়ে হাতে তুলে নিল মিষ্টির ব্যাগগুলো। নাবিলের কথা মনে করেই তো এতগুলো মিষ্টি কেনা, সাথে আবার প্রথম পিরিয়ডের সেই লেকচার নোটসগুলোও ব্যাগের ভেতর যত্নে রাখা আছে।
বিশাল কাঠের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অর্ণা একবার চোখ বুজে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিল।
‘আল্লাহ... এত নার্ভাস লাগছে কেন?’—নিজের অজান্তেই ফিসফিসিয়ে উঠল সে। বুকটা যেন ড্রাম পেটানোর মতো ধড়ফড় করছে।
আর ইতস্তত না করে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে নাবিলকে কল দিল অর্ণা। দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে নাবিলের পরিচিত ও একটু উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘পৌঁছে গেছিস?’

‘হ্যাঁ। গেটের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছি।’

‘দাঁড়া, আমি এসে গেট খুলে দিচ্ছি।’
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ভারী দরজা শব্দ করে খুলে গেল। অর্ণা ধীর পায়ে ভেতরে পা রাখল।

কিন্তু আজ ভেতরে পা দিতেই সেই পরিচিত বাড়িটাকে কেমন যেন অচেনা আর থমথমে লাগল। আগে সে যখন এসেছিল, তখন তো চারপাশটা হাসি-ঠাট্টা আর কোলাহলে গমগম করছিল! অথচ আজকের নীরবতাটা অন্যরকম।পুরো বাড়িটায় যেন একটা ভারী, চাপা আর একাকী বিষাদ জমে আছে।অর্না যখন এসেছিল নিহাল দেশে ছিল না তাই তার সাথে দেখা হয়নি।কিন্তু আজকে,,,,

নাবিল অর্নার হাত থেকে মিষ্টির সবকটি প্রিমিয়াম প্যাকেট এক এক করে নিজের কবজায় নিতে নিতে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
‘কিরে! একেবারে গোটা মিষ্টির দোকানটাই তুলে নিয়ে চলে এসেছিস নাকি?’
অর্না কিছুটা ইতস্তত করে নিচু গলায় বলল,
‘স্যার ঠিক কোন মিষ্টি পছন্দ করেন আমি তো তা জানি না। তাই কোনটা ছেড়ে কোনটা আনব বুঝতে না পেরে আন্দাজেই এগুলো নিয়ে নিলাম...’

নাবিল ঠোঁট চেপে একগাল হেসে বাড়ির ভেতরে পা বাড়াল। অর্নাও তার পিছু পিছু ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চারপাশটা অদ্ভুত এক মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে লাগল। বাড়িটা সুবিশাল, তাদের নিজেদের বাড়ির চেয়েও অনেক বড়! আর ভেতরকার আধুনিক প্রিমিয়াম ইন্টেরিয়র ডিজাইন এতটাই নিখুঁত ও রুচিশীল যে একপলক তাকালেই চোখ আটকে যায়। অর্না বিস্ময়ভরা চোখে চারপাশের আভিজাত্য পর্যবেক্ষণ করতে করতে নাবিলের অনুগামী হলো।
নাবিল সোজা এসে থামল কিচেনের সামনে। ভেতরে আফরোজা বেগম নিজেই দুপুরের রান্নাবান্নার দেখভাল করছেন, আর হেল্পিং হ্যান্ড সযত্নে সব সরঞ্জাম গুছিয়ে ও এগিয়ে দিচ্ছে।
নাবিল কোনো রকম আগাম বার্তা না দিয়েই উৎফুল্ল গলায় ডেকে উঠল,
‘আম্মু দেখো! তোমার ব... থুরি, তোমার অর্না এসেছে!’

নাবিলের এহেন ফাজিল আর অসতর্ক কাণ্ড দেখে আফরোজা বেগম এক মুহূর্তের জন্য চোখ গরম করে তাকালেন। নাবিল তখন ঠিক অর্নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তাই মায়ের চোখ রাঙানি দেখে অর্নার আড়ালেই হাত জোড় করে ইশারায় একটা 'সরি' চেয়ে নিল। আফরোজা বেগমও সাথে সাথে চুলার আঁচটা একদম কমিয়ে দিয়ে কিচেন থেকে বের হয়ে এলেন।

অর্না আফরোজা বেগমকে সামনে দেখেই মুখে মিষ্টি এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘কেমন আছেন আন্টি?’
আফরোজা বেগম মমতামাখা হাতে অর্নার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর এক হাত বাড়িয়ে তাকে আলতো করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললেন,
‘আমি খুব ভালো আছি রে মা। তুই কেমন আছিস? সেই যে তোর ভাইয়ের বিয়েতে তোর সাথে দেখা হলো, তারপর থেকে তো আর একটা খোঁজও নিস না!’
অর্না আফরোজা বেগমের ওম পেয়ে খানিকটা অপরাধবোধ আর লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল,
‘আসলে আন্টি...’
কথাটা অর্না শেষ করার আগেই মাঝখান থেকে ফোঁড়ন কেটে বসল নাবিল,
‘আম্মু! ও তোমার খোঁজ আর কী নেবে বলো? ও নিজেই তো যেখানে-সেখানে হঠাৎ চিৎপটাং হয়ে পড়ে থাকে! আর তখন ভাইয়াকে গিয়ে হিরোর মতো ওকে উদ্ধার করতে হয়।’
নাবিলের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বেফাঁস ফাটানো কথায় অর্না চোখ দুটো গোল গোল করে তার দিকে রাগী রাগী চোখে তাকাল। সেই তীব্র দৃষ্টির সামনে পড়ে নাবিল সাথে সাথে মুখে কুলুপ আঁটল। আফরোজা বেগম ছোট ছেলের কথা একদম গায়ে না মেখে অর্নার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন,
‘তোর স্যারকে দেখতে এসেছিস তো? যা মা, তোর স্যার তিনতলায় নিজের ঘরে আছে।’
আফরোজা বেগমের মুখে 'তোর স্যার' শব্দটা শুনে অর্নার গাল দুটো নিমেষেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সেই সাথে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। সব এই ফাজিল নাবিলটার জন্য! মান-সম্মানের আর কিছু অবশিষ্ট রাখল না ছেলেটা। নাবিলের ওপর মনে মনে ভীষণ রাগ পুষে রাখল সে।আজকে এর একটা হিল্লে করতেই হবে!
নাবিল আর দেরি না করে অর্নার কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে তাগাদা দিল,
‘হ্যাঁ চল, আর দেরি করিস না। নোটসগুলোও নেওয়ার আছে। চল উপরে।’

অর্না আফরোজা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নাবিলের পাশে পাশে হেঁটে সিঁড়ির দিকে এগোল। কাঠের রাজকীয় সিঁড়িতে পা রাখতেই সুযোগ বুঝে অর্না সজোরে ধাম করে একটা কিল বসিয়ে দিল নাবিলের পিঠে। নাবিল ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠার ভান করে নিচু গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
‘আহ্! মরেই গেলাম রে! বিয়ের আগেই আমার বেচারা হবু বউটা বিধবা হয়ে গেল! বউ গো ও বউ... আমি তোমাকে একটু মন ভরে আদরও করতে পারলাম না এই পেত্নীটার জ্বালা-যন্ত্রণে!’

অর্না দ্রুত পা চালিয়ে নাবিলের পাশে এসে ফিসফিস করে খেঁকিয়ে উঠল,
‘আন্টিকে এসব কী হাবিজাবি বলছিলি তুই? পাগল নাকি? আন্টি এখন আমার ব্যাপারে কী ভাববেন বল তো?!’
নাবিল কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্ভাবনায় জবাব দিল,
‘আরে ধুর! কিচ্ছু ভাববেন না। আমার মা ভীষণ মডার্ন মা! এসব স্টোরি ওনার কাছে একদম ডালভাত। চল তো তুই!’

সিঁড়ি দিয়ে অর্না যত ওপরের দিকে উঠতে লাগল, তার বুকের ভেতরটা তত বেশি দুরুদুরু করতে লাগল। দোতলার বিশাল লবি পেরিয়ে যখন তিনতলার দিকে ওঠার সিঁড়িতে পা রাখল, তখন অর্না কৌতুহল আর ইতস্তত সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
‘আচ্ছা, তোরা না দোতলায় থাকিস?’
নাবিল খানিকটা ঘাড় ঘুরিয়ে অর্নার দিকে তাকিয়ে ব্যাখ্যা দিল,
‘হ্যাঁ। আমি, আম্মু আর আব্বু দোতলায় থাকি। আর এই পুরো তিনতলাটা হচ্ছে আমাদের মহীয়ান ভাইয়ার নিজস্ব রাজ্য! উনার অনুমতি ছাড়া এই রাজ্যে মাছি গলারও সাহস পায় না।’
অর্না ভয়ে ভয়ে ওড়নার আঁচল চেপে ধরে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘তাহলে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিস কেন? তোদের মহীয়ান ভাইয়া কি আমাকে দেখে আনন্দে নাচতে নাচতে ঢুকতে দেবে মনে হয়?’
নাবিল রহস্যময় এক হাসি হেসে বলল,
‘যেভাবেই হোক, আমার তো মনে হয় তোকে ঢুকতে দেবেই!’
কথাটা শুনে অর্না সিঁড়ির ঠিক মাঝপথেই হুট করে দাঁড়িয়ে গেল। অর্নাকে ওভাবে থমকে যেতে দেখে নাবিলও বাধ্য হয়ে থামল। অর্না তীব্র রাগে আর আত্মসম্মানের টানে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘আমার কি কোনো মান-সম্মান নেই নাকি রে নাবিল? তোর ভাইয়ের ঘরের দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে তুই আমাকে অপমান করে ফেরত আনবি, আর আমি হাসিমুখে সহ্য করব? আমি কিচ্ছুতেই যাব না, তুই নিজে যা!’
নাবিল দু-হাত তুলে শান্ত করার ভঙ্গিতে ইশারা করে বলল,
‘আহা! এত হাই-প্রেসার নিচ্ছিস কেন? আমি তোকে গ্যারান্টি দিচ্ছি, ভাইয়া তোকে ঢুকতে পারমিশন দেবে। তুই না হয় মিলিয়ে নিস! আর যদি সত্যি পারমিশন না দেয়, তখন তুই আমাকে আরও দুটো রাম-কিল বসিয়ে দিস, ওকে?’

অর্নাকে কোনোমতে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নাবিল অবশেষে নিহালের ঘরের প্রকাণ্ড দরজার সামনে এনে দাঁড় করাল। দরজাটা দেখে অর্নার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! পুরো দরজাটাই হাই-টেক ডিজিটাল লকে মোড়ানো এবং অত্যন্ত দৃশ্যমানভাবেই সাউন্ডপ্রুফ। সেখানে ডিজিটাল পাসকোডের বাটন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার, ফেস-রিকগনিশন সেন্সরসহ আরও কত কী সেট করা! অর্না বিস্ময়ে হাঁ করে দরজার সিকিউরিটি প্যানেলের দিকে তাকিয়ে নাবিলকে জিজ্ঞেস করল,
‘এটা কি কোনো প্রাইভেট সুইস ব্যাংকের সিকিউরিটি ভল্ট নাকি রে? এত কড়া সিকিউরিটি কেন?’
অর্নার চোখ জোড়া দেখে নাবিল মুচকি হেসে বলল,
‘ভাইয়া মানুষটাই এরকম! নিজের পার্সোনাল স্পেস আর নিজের জিনিসপত্রের ব্যাপারে ও ভীষণ প্রোটেকটিভ।’
কথাটা বলতে বলতেই নাবিল প্যানেলের ওপর থাকা বিশেষ একটা ব্লুটুথ বাটনে আলতো করে চাপ দিল। অর্না চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
‘এটা আবার কিসের সুইচ?’
‘এটা কলিং বেল আর ইন্টারকমের কম্বো। ভাইয়া ভেতরে সিগন্যাল পেলে আমি উনাকে বলব তুই এসেছিস, তারপর উনি ভেতর থেকে অ্যাকসেস দিলে লক খুলবে।’
নাবিলের কথা শুনে অর্না নিজের কপালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে বিড়বিড় করল,
‘হে মহান আল্লাহ! কার পাল্লায় পড়লাম! চল নাবিল, তুই আমাকে নিয়ে চল। এমন অসামাজিক লোকের সাথে আমার কোনো দেখা করার দরকার নেই!’

নাবিল সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজার সেন্সরে একটা ছোট লাল লাইট নিভে গিয়ে চকচকে সবুজ আলো জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এক মৃদু বিপ শব্দ হলো।
নাবিল অর্নার দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হেসে বলল,
‘এই যে দেখ! ভাইয়া গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে। আমি বলছি, দাড়া...’
নাবিল গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে ইন্টারকমে স্পষ্ট করে বলল,
‘ভাইয়া, অর্না এসেছে। তুমি অসুস্থ তো, তাই ও নোটস দিতে আর দেখা করতে এসেছে।’
কথাটা শেষ হওয়ার এক সেকেন্ডের মধ্যেই দরজার হাই-টেক লকটা ‘ক্লিক’ করে ভারী একটা শব্দ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনলক হয়ে গেল।প্যানেলে আনলকের সংকেত ফুটতেই নাবিল মিটিমিটি হেসে অর্নার দিকে তাকাল,
‘ভেতরে যা! দেখলি তো, ভাইয়া লক খুলে দিয়েছে।’
অর্নার বুকের ভেতরটা এবার সত্যি সত্যি আতঙ্কে কেঁপে উঠল। এত বড় একলা ঘরে একা যাবে সে?!
সে ভয় পাওয়া চোখে নাবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি একা যাব ভেতরে?! তুইও চল না আমার সাথে!’
নাবিল দুই দিকে মাথা নেড়ে সাফ না করে দিল,
‘উঁহু! আমি কিন্তু আমার আসার কথা বলিনি, আমি শুধু তোর কথা বলেছি বলেই ভাইয়া লক খুলেছেন! তুই ভেতরে গিয়ে দেখা করে আয়। আমি দোতলায় যাচ্ছি।’
অর্নাকে কিছু বলার সুযোগটুকু না দিয়ে নাবিল এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার দিকে নেমে গেল। আর অর্না একা দাঁড়িয়ে রইল নিহালের সেই রহস্যময়, অর্ধ-উন্মুক্ত দরজার সামনে।

নাবিল দোতলার দিকে চলে যাওয়ার পর অর্ণা হাত-পা ঠান্ডা হয়ে নিহালের ঘরের দরজার সামনে একা দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা হাতুড়ির মতো পিটছে। কিছুক্ষণ দ্বিধায় থেকে শেষমেশ সাহসে ভর দিয়ে দরজাটা আলতো ধাক্কা দিল সে।
দরজাটা নিঃশব্দে কিছুটা খুলে গেল। ঘরের ভেতরে ঢুকে অর্ণার চোখজোড়া বিস্ময়ে একটু বড় হয়ে গেল।তবে বিস্ময় রইল না বেশিক্ষণ।অর্না ঘরে ঢুকতেই দরজাটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে বন্ধ হয়ে গেল।সেই শব্দে লাফিয়ে উঠল অর্না।বুকে সামান্য থু থু করে সামনে তাকালো।

বিশাল ঘরটা শান্ত,আর অদ্ভুত এক স্তব্ধতায় ডুবে আছে। জানালার ভারী পর্দাগুলো সম্পূর্ন টানা,এখন যে ভর দুপুরে সেটা ঘরের মধ্যে বোঝার উপায় নেই। হুট করেই সম্পূর্ন ঘরে লাইট জ্বলে উঠল।আলো জ্বলতে অর্না দেখল সম্পূর্ন ঘরটা পরিপাটি কিছু জিনিস নিখুঁত ভাবে সাজান।সারা ঘরে নিহালের চেনা সুবাস আর হালকা ওষুধের গন্ধ মেশানো এক অন্যরকম বাতাস।সামনে তাকাতেই দেখল ঘরের মাঝখানের প্রকাণ্ড কিং-সাইজ বেডের হেড রেস্টে হেলান দিয়ে বসে আছে নিহাল।

অর্না কিছু বলার পূর্বে নিহাল বলে উঠল,
‘ এখানে কি মনে করে?’

অর্না মনে মনে কষ্ট পেল।কার জন্য সে এলো এই ঠাঠা রোদ মাথায় নিয়ে।তবুও নিজেকে সংবরণ করে বলল,
‘ নাবিল বলল নোটস কথা আর বলল আপনি অসুস্থ তাই,,,

‘ তাই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চলে আসবেন?’
অর্না যেন কেঁপে উঠল নিহালের এমন গলার আওয়াজে এমনিতে তার গুরুগম্ভীর রাশভারী গলার আওয়াজ। এখন অসুস্থতায় যেন সেটা আরও গম্ভীর,ভরাট শোনাচ্ছে।অর্না শুকনো ঢোক গিলে বলল,
‘ আমি চলে যাচ্ছি।’

কথাটা বলেই অর্না ঘুরতে যাবে সেই সময় কানে আসলো নিহালের আদেশ,
‘ এদিকে আসুন মিস.অর্না।’

অর্নার ও জোড়া যেন সেখানে সিমেন্ট বালু দিয়ে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়েছে এমন মনে হচ্ছে।চাইলেও সে নড়তে পারল না।এদিকে নিহালের ঘরময় পুরো তার সুবাস।সেই সুবাসে যেন অর্না মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।চোখে যেন ঝাপসা লাগছে সব।
‘ কিছু বলেছি?’

অর্না নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো।ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বেডের পাশে তবে দুরত্ব রেখে।নিহাল অর্নার ভয়ার্ত চোখ মুখ দেখে প্রশ্ন করল,
‘ মাথা ঘুরছে?’

অর্না দুইদিকে মাথা নাড়ল।বোঝালো না ।
‘ চোখে ঝাপসা দেখছেন? ব্ল্যার?’

অর্না এবার উপর নিচ মাথা নেড়ে নাকে মুখে আওয়াজ তুলে বলল,
‘ হুম।আমি আসি স্যার সাবধানে থাকবেন।’

‘ ওয়েট মিস অর্না।’

অর্না এবার পূর্ন দৃষ্টিতে নিহালের দিকে তাকালো। লক্ষ করল,তীব্র জ্বরের ছোঁয়ায় তার ফরসা মুখটা কেমন যেন লালচে হয়ে আছে। কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে রেশমি চুলগুলো। সবসময় যে মানুষটাকে প্রচণ্ড কঠোর, রাশভারী আর ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ মনে হয় আজ এই অসুস্থ অবস্থায় তাকে বড্ড নিষ্পাপ আর অসহায় লাগছে।অর্ণার বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। অর্না দ্রুত নিজের সরিয়ে নিল নিহালের দিক থেকে।

‘ পানি খান।’
নিহালের কথা প্রথমে বোধগম্য হলো না।পরবর্তীতে অর্না জিজ্ঞাস করল,
‘ জি?’

নিহাল এবার সাইড টেবিলে রাখা কাচের গ্লাসের দিকে চোখ ইশারা করল। তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক রকমের নিচু আর খসখসে,
‘পানিটা খেয়ে নাও। বেটার ফিল করবে।’
অর্নার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক ফোঁটা পানি এখন ভীষণ প্রয়োজন, কিন্তু শরীর আর সাড়া দিচ্ছে না। তার থরথর করে কাঁপতে থাকা পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে গেছে। চারপাশের শান্ত ঘরটা হঠাৎ করেই কেমন যেন ঘুরতে শুরু করল, চোখ দুটো আচ্ছন্ন হয়ে এল ঘোরলাগা ঝাপসা ভাবটায়। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে অর্না কোনোমতে এক পা সামনে বাড়াল টেবিলে রাখা গ্লাসটার দিকে। কিন্তু শরীর তাকে প্রতারণা করল। দু-পা এগোতেই মাথাটা তীব্রভাবে চক্কর দিয়ে উঠল, নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অর্না মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, বিদ্যুৎবেগে নিহালের ডান হাতটা অর্নার বাম কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। এক অনায়াস টানে অর্নাকে সে নিজের উত্তপ্ত, উন্মুক্ত বুকের ওপর এনে ফেলল। অর্না ততক্ষণে আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলেছে। নিহালের সারা শরীরে তখন তীব্র জ্বরের দাবানল, তার বুকের সাথে মিশে থাকা অর্নার অবশ শরীরটা যেন সেই উত্তাপে আরও অসাড় হয়ে গেল। নিহাল অর্নার ফ্যাকাশে, নিষ্প্রাণ মুখের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর অত্যন্ত নিচু আর খসখসে গলায় বিড়বিড় করে বলল,
‘রোগী দেখতে আরও একটা বড় রোগী এসেছে... মাই লো-আয়রন পেশেন্ট।’
নিহাল অপর হাত বাড়িয়ে টেবিলের গ্লাস থেকে খানিকটা ঠান্ডা পানি তুলে নিয়ে অর্নার চোখের চোখের পাতায় ও মুখে ছিটিয়ে দিল। পানির শীতল স্পর্শে অর্নার আচ্ছন্ন ভাবটা এক লহমায় কেটে গেল। সে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই তার রক্তকণিকাগুলো যেন থমকে গেল।স্বয়ং নিহালের উন্মুক্ত, চওড়া বুকের ওপর সে শায়িত! নিহালের উন্মুক্ত বক্ষের তীব্র উত্তাপ আর পেশিবহুল শরীরের মাতাল করা স্পর্শ অর্নার প্রতিটি স্নায়ুতে যেন বিদুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত করল। ভয়ে, এক অজানা শিহরণে তার হৃদপিণ্ড লাফাতে শুরু করল।

অর্না ভীতহরিণীর মতো চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, নিহাল তীব্র ও এক রাশভারী দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে আছে তার দিকে। সেই চাহনিতে কোনো লুকোচুরি নেই, আছে এক দমবন্ধ করা অন্ধকার অধিকারবোধ,দুর্বার আকর্ষণ।যেন চোখের দৃষ্টিতে সে অর্নার ভিতরে চলমান প্রতিটা সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অনুভূতি গুলো বুঝে ফেলবে।
অর্না তীব্র লজ্জায় ও আতঙ্কে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করে মুষড়ে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিক তখনই টের পেল, নিহালের লোহার মতো শক্ত বাহু তাকে আরও গভীরে চেপে ধরেছে নিজের সাথে।যেন বুকের মাঝে মিশিয়ে নিতে চাইছে। অর্নার নড়াচড়া করার কোনো সুযোগই রইল না। কম্পিত, মিনমিনে গলায় সে বলল,
‘স... সরি ! আমি... আমি আসলে…’
‘এই ‘আসলে-নকলে’ করা কবে ছাড়বে, স্নোড্রপ?’
অর্নার বুকের ভেতরটা তীব্র এক ধাক্কা খেল। নিহাল স্যার তাকে ‘তুমি’ করে বলল?! আর... ‘স্নোড্রপ’? সেটা আবার কী! নিহালের মুখের এই গভীর, সম্মোহনী আর আধিপত্য বিস্তারকারী ডাক শুনে অর্নার মস্তিষ্ক যখন অবশ হতে বসেছে, ঠিক তখনই ঘনিয়ে এল আরেক বিপত্তি।হঠাৎ আলো নিভে গেল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটা কুচকুচে কালচে অন্ধকারে ডুবে গেল।
অন্ধকারের সুযোগে নিহালের বুকের স্পন্দন আরও দ্রুত হলো। সে একটা শক্ত ঢোক গিলে মনে মনে কড়া গলায় বলল,
‘আমাকে অসংযমী করার সমস্ত বন্দোবস্ত আজ তোমার এই নিস্তারহীন উপস্থিতি।’
অন্ধকারের বুক চিরে অর্নার ভেজা, মিনমিনে কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘আ... আমি বাড়ি যা…’
কথাটা শেষ হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিল না নিহাল। অর্নাকে সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তে এনে এক নিমেষে ঘুরিয়ে দিল সে।আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল নরম বিছানার ওপর। অন্ধকারের মাঝেই নিহাল এক হাতে অর্নার দুটো হাতকে মাথার ওপরে তুলনামূলক শক্ত বাঁধনে আটকে ফেলল। অন্য হাতটা অর্নার ঘাড়ের তল দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে তার রেশমি চুলে নিজের আঙুলগুলো গলিয়ে দিল।
অর্নার ঠোঁটের একদম কাছাকাছি নিজের উত্তপ্ত ঠোঁটজোড়া এনে নিহাল তার নিগূঢ়, ভারী আর মাতাল করা উষ্ণ শ্বাসের সাথে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
‘লেট মি লুজ মাইসেলফ ইন ইউ... আই ডোন্ট হ্যাভ দ্য স্ট্রেন্থ টু হোল্ড মাইসেলফ ব্যাক এনিমোর। হোয়েন উইল ইউ ট্রুলি বি মাইন, স্নোড্রপ।’
#চলবে
#লেখনী_রুহিতা
পর্ব -২৩(শেষাংশ)কার্টেসি ছাড়া কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ

Category

Address


Rahattar Pool
Patenga

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Natural Touch posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Subscribe

We will notify you when anything happens in Patenga.