AMIM
লেখা লেখি করি, গান গজল লিখতে ও গাইতে পছন্দ করি।
জাতীয়তায়, ভাষা, সংস্কৃতি তে আমি একজন বাঙালী। স্বাধীন বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক। বাংলার প্রত্যন্ত এলাকার খুব সাধারণ মধ্যবৃত্ত মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা একজন গ্রাফিক ডিজাইনার, প্রচ্ছদ শিল্পী, ক্যালিগ্রাফার, অলংকরণার, লিরিকিস্ট, লেখক, গায়ক, সম্পাদক, সমালোচক। আমার নাম এইচ আমীম। আমার জন্মজেলা সাতক্ষীরা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন উপকূলের গাঁ ঘেষা সদর শ্যামনগর। এই শ্যামনগর ই আমার উপজেলা। যেখানে রয়েছে আমার হাজার হাজার বারের পায়ের আনাগোনা। সেখানকার মাটির স্পর্শ। শিক্ষা জীবনের শুরুটা আমার মাদ্রাসা থেকে। সেখান থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছি। এরপর জেনারেল শিক্ষাঙ্গণে পাবলিক বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ে মহান মালিকের অনুগ্রহে পা রাখতে সক্ষম হয়েছি।
মাতৃভূমি, মাতৃভূমির মানুষ, দেশ ও দেশের সভ্য সংষ্কৃতি ভালোবেসে সুন্দর সততার চিন্তা করি। মানুষকে কল্যাণের দিকে, কল্যাণের পথে আহ্বান করি।
06/08/2026
জুম্মা মোবারক 🕋
আজ কাহাফ পড়ার দিন👈
চোখে দেখা ইতিহাস যদি অল্প ক'দিনের ব্যবধানে বদলাতে পারে! তবে বাংলার জন্ম গল্প কোথা থেকে কোথায় গেছে সহজে অনুমেয়।
02/08/2026
চায়ে আসক্তি নেই এমন কতজন আছেন আমার লিস্টে ? দেখতে চাই আপনাদের। 👀
ছবি : সংগৃহীত.....
31/07/2026
হাসপাতালের ধবধবে সাদা বেডে শুয়ে আছে তারিক। ঘটনার পর এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। তার শরীরের বাইরের ক্ষতগুলো উন্নত চিকিৎসার কারণে আস্তে আস্তে শুকিয়ে আসছে, কিন্তু তার মনের ভেতরের সেই দগদগে আসল ক্ষত—মা আর বাবার অকাল ও নৃশংস চলে যাওয়া, তা হয়তো এই জন্মে আর কোনোদিনও শুকাবে না। তারিক সারাদিন চুপচাপ জানালার বাইরে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার পুরো পৃথিবীটা এখন এক নিরেট ও নিঃসীম একাকীত্বে ভরা। তার ল্যাপটপ নেই, তার লেখার খাতাগুলো এখন শূন্য।
মধু প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালেই কাটায়। সে তার নিজের রক্ষণশীল পরিবারকে সম্পূর্ণ মনে মনে ত্যাগ করেছে। যে পরিবার সংকরের মতো একটা পিশাচের কথা শুনে নিজের গর্ভজাত মেয়েকে পশুর মতো বন্দী করতে পারে এবং এক নিষ্পাপ পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, সেই পরিবারের সাথে মধু আর কোনোদিনও রক্তের সম্পর্ক রাখতে চায়নি। সে এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন, তবে একাকী।
আজ বিকেলে মধু একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে এসে তারিকের পাশে বসল। সে আলতো করে তারিকের কপালে হাত রেখে আদর করে বলল, "আজ ডাক্তার তোমাকে রিলিজ দেবে বলেছে। তুমি এখন মানসিকভাবে আর শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। আমাদের এবার বাড়ি ফিরতে হবে।" তারিক মধুর দিকে তার সেই মায়াবী চোখে তাকাল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে বালিশে পড়ল। "সুস্থ হয়ে আমি কোন বাড়িতে যাব মধু? আমার সেই হাসিখুশি ছোট বাড়িটা তো এখন এক শ্মশানপুরী। সেখানে আমার মা নেই, বাবা নেই, কেউ আমাকে খোকা বলে ডাকবে না। আমার ডায়েরির পাতাগুলো ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে। আমি এখন কার জন্য, কোন পরিচয়ে বাঁচব?"
মধু তারিকের দুটি হাত নিজের গালের সাথে শক্ত করে ঠেকাল। তার চোখ থেকেও জল পড়ছিল, কিন্তু কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত গভীর, আন্তরিক ও প্রত্যয়ী। "তুমি আমার জন্য বাঁচবে, তারিক। আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছি কোনো ধর্মের ঠুনকো নিয়মের জন্য নয়, কোনো সমাজের লাইক-কমেন্টের জন্য নয়। আমাদের ভালোবাসার এই বুনো টানে পুরো বিশ্ব আজ আমাদের চেনে। তোমার মা-বাবার আত্মা আজ ওপর থেকে আমাদের দেখছে। তোমার বাবা-মাকে আমি বাঁচাতে পারেনি। আবার তারা মরেছেও এই আাম তোমার জীবনে আসার জন্য। তাই আমার ওপর দায়িত্ব তোমার খেয়াল রাখার। আমি সেই পবিত্র দায়িত্ব আজীবন আমার সিঁথির মূল্যে পালন করতে চাই।"
তারিক অবাক হয়ে মধুর এই দৃঢ় চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। মধু বলতে লাগল, "আমি এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি তারিক। আমি আমার সনাতন ধর্ম স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে মুসলিম হব। আমি মধুমিতা থেকে শুধু তোমার 'মধু' হব। আমি তোমার ছায়া হয়ে, তোমার জীবনের সেই অন্ধকার শূন্য ঘরটাকে আবার আমার লেন্সের আলো দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে চাই। আজই হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে আমরা সরাসরি কাজী অফিসে যাব। আজই আমাদের এক হওয়ার দিন, আজ আমাদের বিয়ের দিন।"
তারিক মধুর চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনের সমস্ত একাকীত্ব আর অন্ধকারের অবসান দেখতে পেল। সে বুঝল, এই মেয়েটি তার জন্য যা করেছে, তা পৃথিবীর কোনো কাল্পনিক উপন্যাসের বা গল্পের নায়িকার পক্ষেও করা সম্ভব নয়। সে নিজের সমস্ত শারীরিক কষ্ট ভুলে মধুকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে টেনে নিল। হাসপাতালের সেই ছোট্ট কেবিনে দুটি ভিন্ন ধর্মের আত্মা এক হয়ে গেল এক পরম পবিত্র অনুভূতির চাদরে।
বিকেলের সূর্যটা যখন পশ্চিম আকাশে ম্লান হয়ে আসছিল, মধু লাল রঙের একটা সাধারণ সুতি শাড়ি পরে তৈরি হয়ে নিল। তারিক একটা সাদা পাঞ্জাবি পরল। তারা হাসপাতাল থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি রওনা দিল সেই পুরোনো, চেনা কাজী অফিসের উদ্দেশ্যে। তারা জানত না, চক্রান্তকারীরা হয়তো সাময়িকভাবে হেরে গেছে, সংকর হয়তো জেলে, কিন্তু সংকরের গ্যাংয়ের বাকি সুপ্ত ও বিপজ্জনক অংশটি তখনো এক শেষ কামড় দেওয়ার জন্য অন্ধকারের কোণায় অস্ত্র হাতে ওত পেতে বসে আছে।
সব কিছুই যেন একটা অদ্ভুত সময়ের বৃত্তের মতো ঘুরে আবার সেই একই বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে এই গল্পের শুরু হয়েছিল। কালো কাপড়ের ওপাশ থেকে দুটো হিংস্র, চেনা চোখ—সংকরের সেই বিশ্বস্ত ভাড়াটে শুটার। যাকে মধু চোখি দেখেই চিনে ফেললো- ইনি তো সংকরের বন্ধু রঘু। যে এখনো পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিশোধের জন্য। কিন্তু কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সব কিছু শেষ হয়ে গেল। কোনো কথা না বলে লোকটা ট্রিগার চাপল রঘু। রক্তের এক বিশাল আলপনা এঁকে মধুর শরীরটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। লাল শাড়ির আঁচলটা মুহূর্তের মধ্যে রক্তের বন্যায় ভেসে যেতে লাগল। মুখোশধারীরা যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই ঝড়ের গতিতে করিডোর দিয়ে পালিয়ে গেল। তাদের চলে যাওয়ার প্রতিধ্বনি আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল ক্যাফে বা জুট মিলের সেই পুরোনো অন্ধকারের মতো।
তারিক কাঁপতে কাঁপতে মধুর মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। মধুর চোখের পাতা দুটো ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে, এক অনন্ত ঘুমের দেশ তাকে ডাকছে। তার ফর্সা গালে তারিকের চোখের জল আর বুকের তাজা রক্ত মিশে এক অদ্ভুত নান্দনিক অথচ নিষ্ঠুর রঙের সৃষ্টি করেছে। মধুর ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছে, যেন সে শেষবারের মতো বলতে চাইছে—"আমি তোমার গল্পেই চিরকালের জন্য থেকে গেলাম, তারিক... আমার লেন্সের ওপারে তুমি থেকো..."
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : শেষপর্ব
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
30/07/2026
মধুর বাড়ির বাইরে তখন শত শত সাংবাদিকের ভিড়, ওবি ভ্যান, ক্যামেরার অনবরত ফ্ল্যাশ আর হাজারো সাধারণ মানুষের স্লোগান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশের একটি বিশেষ সোয়াট টিম এবং ডিবি পুলিশ যৌথভাবে মধুর বাড়ির সদর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। মধুর বাবা-মা তখন ভয়ে ড্রয়িংরুমের কোণায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের সমস্ত অহংকার আর জেদ তখন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।
পুলিশের এসি সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, "আপনাদের বিরুদ্ধে একটা মেয়েকে অবৈধভাবে বন্দী করে রাখা, তার মানবাধিকার লঙ্ঘন করা এবং একটি জোড়া খুনের মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগ আছে। ঘরটি কোথায় যেখানে মধুকে রেখেছেন?" মধুর বাবা কাঁপতে কাঁপতে পকেট থেকে স্টোর রুমের চাবিটা পুলিশ অফিসারের দিকে এগিয়ে দিলেন।
ভারী লোহার তালাটা যখন খট শব্দ করে খুলল, মধু তখন মেঝেতে বসে নিজের শেষ ভিডিওর কমেন্টগুলো স্ক্রল করছিল। দরজা খোলার তীব্র আলোয় সে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দেখতে পেল। এসি সাহেব নিজে এগিয়ে এসে মধুর মাথায় হাত রাখলেন। "বোন মধু, তুমি মুক্ত। তোমার সাহস আর এই ভার্চুয়াল লড়াইকে পুরো দেশ স্যালুট জানাচ্ছে। আমরা সংকরের আইপি অ্যাড্রেস এবং ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে তাকে অলরেডি বর্ডার এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছি। সে এখন আমাদের হেফাজতে।"
মধু ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে নিজের মুক্তির কোনো আনন্দ ছিল না, সেখানে ছিল একটাই প্রশ্ন, "তারিক? তারিক কোথায়? ও কি বেঁচে আছে?" পুলিশ অফিসার বললেন, "সংকরকে রিমান্ডে নিয়ে আমাদের টিম জেরা করছে। সে প্রথমে মুখ না খুললেও আমাদের স্পেশাল ট্রিটমেন্টের পর স্বীকার করেছে তারিককে কোথায় রাখা হয়েছে। একটি পুরোনো পরিত্যক্ত জুট মিলের আন্ডারগ্রাউন্ড টর্চার সেলে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। আমাদের টিম এখনই সেখানে রেইড দিতে যাচ্ছে। তুমি কি আমাদের সাথে আসবে?" মধু এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। "হ্যাঁ, আমি যাব। আমি নিজের চোখে ওকে দেখতে চাই।"
পুলিশের গাড়ির তীব্র সাইরেন বাজিয়ে কনভয় ছুটে চলল ঢাকার অদূরে সেই নির্জন ও পরিত্যক্ত জুট মিলের দিকে। মধুর বুকটা তখন দুরুদুরু কাঁপছিল। তারিক কি বেঁচে আছে? নাকি তাকেও তার বাবা-মার মতো কোনো ঠান্ডা বুলেটে শেষ করে দেওয়া হয়েছে? মধু মনে মনে তার চেনা ঈশ্বর আর প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করতে লাগল।
জুট মিলে যখন পুলিশের টিম পৌঁছাল, তখন রাত প্রায় বারোটা। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার আর জঙ্গলঘেরা। পুলিশ চারপাশ থেকে আধুনিক অস্ত্র নিয়ে এলাকাটি কর্ডন করে ফেলল। ভেতরে থাকা সংকরের সেই কালো পোশাকধারী গ্যাংয়ের কয়েকজন অবশিষ্ট সদস্য পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল। শুরু হলো দুপক্ষের মধ্যে এক তীব্র ও রোমাঞ্চকর বন্দুকযুদ্ধ।
দুড়ুম! দুড়ুম! ঠাং! গুলির শব্দে চারপাশের রাতের নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল। বনের পাখিরা কিচিরমিচির করে উড়ে গেল। মধু পুলিশের সাঁজোয়া গাড়ির ভেতরে বসে কান বন্ধ করে হৃদয়ের স্পন্দন গুনছিল। কয়েক মিনিটের তীব্র ও মুখোমুখি লড়াইয়ের পর খুনিদের দুজন পুলিশ এনকাউন্টারে নিহত হলো এবং বাকি দুজন অস্ত্র ফেলে হাত তুলে আত্মসমর্পণ করল।
পুলিশ প্রধান ভেতরের আন্ডারগ্রাউন্ডের ভারী লোহার দরজাটা গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে ভেতরে ঢুকল। মধু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে গাড়ির দরজা খুলে পুলিশের পেছন পেছন সেই অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে আর দুর্গন্ধযুক্ত ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরের একদম শেষ কোণায় একটা লোহার চেয়ারে চেইন দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিল একটা নিথর শরীর। এটায় তারিক। তার পরনের সেই সুন্দর নেভি ব্লু শার্টটা এখন ছিঁড়ে ফালি ফালি হয়ে গেছে, শরীরে চাবুকের আর গরম রডের মারের অসংখ্য ক্ষত। মুখটা রক্তে, পুঁজ আর কালশিটে মাখানো। সে আধো-বোজা চোখে টর্চের আলোর দিকে তাকাল। তার সেই স্মার্ট চেহারাটা এখন চেনা যাচ্ছিল না।
মধু এক তীব্র চিৎকার দিয়ে সমস্ত বাধা ভেঙে তারিকের দিকে ছুটে গেল। "তারিক! ওগো চোখ খোলো!" সে নিজের হাতে তারিকের চেইনের বাঁধনগুলো খুলে দিল। তারিক মধুর গলার সেই চিরচেনা বুনো আওয়াজ পেয়ে আস্তে আস্তে চোখ মেলল। তার শুকনো, ফেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এক অবিশ্বাস্য ম্লান ও পবিত্র হাসি ফুটে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, "আমি জানতাম... আমার প্রকৃতির রানী আমাকে এই নরক থেকেও ঠিক খুঁজে বের করবে। আমার বিশ্বাস হারায়নি মধু।"
তারিককে দ্রুত স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। মধু তারিকের বরফের মতো ঠাণ্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের ওমে শক্ত করে ধরে রইল। তারা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সব চক্রান্ত, সব হ্যাকিং আর অন্ধকারকে হারিয়ে আজ একে অপরকে ফিরে পেয়েছে। কিন্তু এই জয়ের পেছনের মূল্য যে বড্ড বেশি—তারিকের মা-বাবার চিরকালের বিদায়। এতক্ষণে তারিককে জানানো হল তার পরিবারের সেই নৃশংসতা। (চলবে..)
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : ৮
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
29/07/2026
স্টোর রুমের এক কোণায় স্তিমিত ও মলিন আলোর নিচে বসল মধু। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, কিন্তু চোখে এক তীব্র ও অদম্য প্রতিজ্ঞার আলো। সে ফোনের ক্যামেরাটা অন করে ভিডিও রেকডিং শুরু করল। কোনো স্ক্রিপ্ট নেই, কোনো কৃত্রিম সাজগোজ নেই—সবকিছু ছাপিয়ে সেখানে প্রকাশ পাচ্ছিল বুকের ভিতরে জমানো কান্না আর সত্যের আদিম শক্তি।
"নমস্কার। আমি মধুমিতা। আপনারা যারা এতদিন আমার পেজে বন্য পাখি আর প্রকৃতির ভিডিও দেখেন, আজ তাদের কাছে আমি প্রকৃতির চেয়েও এক ভয়ঙ্কর ও বাস্তব সত্য প্রকাশ করতে এসেছি..." মধুর গলাটা প্রথম দিকে সামান্য কাঁপলেও আস্তে আস্তে তা ইস্পাতের মতো শক্ত ও গম্ভীর হয়ে উঠল।
সে প্রথম থেকে সব ঘটনা বলতে শুরু করল। কীভাবে তারিক নামের এক নিঃসঙ্গ, প্রতিভাবান গল্পকার তার জীবনের আলো হয়ে এসেছিল। কীভাবে সমাজ আর ধর্মের দুর্ভেদ্য দেওয়াল ভেঙে তাদের মধ্যে এক পবিত্র আত্মিক প্রেম হয়েছিল। তারপর সে একে একে বলতে লাগল সেই বিভীষিকাময় সত্যগুলো—ধানমন্ডির ক্যাফে থেকে চারজন কালো পোশাকধারীদের মাধ্যমে তারিককে সবার সামনে থেকে গুম করা, তারিকের বাসায় তার বৃদ্ধ বাবা-মার নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং নিজের পাশের বাড়ির ছেলে সংকরের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত আইডি হ্যাক করার সমস্ত হ্যাকিং প্রসেস।
মধু ভিডিওতে সরাসরি সংকরের নাম উল্লেখ করে বলল, "সংকর নামের এই ছেলেটি আমার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত গোপন তথ্য হ্যাক করে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে এবং আমার প্রেমিক তারিককে এক অজ্ঞাত, অন্ধকার শক্তির হাতে তুলে দিয়েছে। আজ আমি আমার নিজের ঘরে বন্দী, আমার বাবা-মা আমাকে আটকে রেখেছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে এর জন্য সংকর এবং সেই কালো পোশাকধারী খুনিরাই দায়ী থাকবে। আমি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমার পেজের ফলোয়ার এবং বিশ্ববাসীর কাছে বিচার চাই। আমার নির্দোষ তারিক কোথায়? কেন এক সাধারণ লেখক আর তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে এভাবে শেষ করে দেওয়া হলো? আপনারা কি এর বিচার করবেন না?"
মধু ভিডিওটি কোনো এডিট না করেই সরাসরি তার পেজে আপলোড করে দিল। এটি ছিল একটি ধারাবাহিক ‘ব্লগ সিরিজ’-এর প্রথম পর্ব। সে মনে মনে ঠিক করল, সে প্রতিদিন এই ঘর থেকে একটা করে নতুন পর্ব ছাড়বে যতক্ষণ না তারিক উদ্ধার হচ্ছে এবং খুনিরা শাস্তি পাচ্ছে।
ভিডিওটি আপলোড হওয়ার ঠিক তিরিশ মিনিটের মধ্যে ইন্টারনেট দুনিয়ায় যেন একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটল। মধুর পেজের লক্ষ লক্ষ ফলোয়াররা স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে গেল। ভিডিওটি শেয়ার হতে লাগল ঝড়ের গতিতে, লাখ লাখ টাইমলাইনে তা ছড়িয়ে পড়ল। হাজার হাজার কমেন্টে ছেয়ে গেল সোশ্যাল মিডিয়া। মানুষের মনে এক তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলো—কীভাবে একটা স্বাধীন মেয়েকে এভাবে ঘরে বন্দী করে রাখা যায়? কীভাবে একটা পুরো মধ্যবিত্ত পরিবারকে চোখের সামনে উধাও ও খুন করে দেওয়া হয়?
পরের দিন মধু দ্বিতীয় পর্ব আপলোড করল। এবার সে তারিকের সেই ডায়েরির কিছু গুরুত্বপূর্ণ পাতা ক্যামেরার সামনে দেখাল, যা সে তার বাসা থেকে নিয়ে এসেছিল। ডায়েরির পাতায় দেখা গেল, তারিক আসলে আইটি কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করার সময় সরকারি বা কোনো বড় কর্পোরেট মহলের এক বিশাল সাইবার দুর্নীতির ডাটা ও হ্যাকিং ফাইল ট্র্যাক করে ফেলেছিল। আর সেই কারণেই তাকে গুম করা হয়েছে এবং সংকর সেই ডাটা চুরির হ্যাকিং পার্টনার হিসেবে কাজ করেছিল টাকার লোভে।
ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই সুনামি এবার আর শুধু ফেসবুকের চার দেওয়ালে আটকে রইল না। দেশের মূলধারার আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নিউজ পোর্টালগুলো এই খবর ব্রেকিং নিউজ হিসেবে লুফে নিল। "ফেসবুক টপ ফ্যানের প্রেম ও রক্তক্ষয়ী গুম"—এই শিরোনামে প্রতিটি চ্যানেলে মধ্যরাতের টকশো শুরু হয়ে গেল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আর সাধারণ জনতা মধুর বাড়ির সামনে এসে ভিড় করতে লাগল, স্লোগান দিতে লাগল।
সংকর আর মধুর বাবা বুঝতে পারল পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তাদের হাতের বাইরে চলে গেছে। সংকর তখন বুঝতে পারল পুলিশ তাকে খুঁজছে, সে গা ঢাকা দেওয়ার জন্য বর্ডার এলাকার দিকে রওনা দিল। কিন্তু ততক্ষণে পুরো দেশবাসী সংকরের ছবি আর আইডিতে থুথু ফেলছে, তাকে ইন্টারনেটের সবচেয়ে ঘৃণিত ভিলেন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর ওপরমহল থেকে তীব্র চাপ এল। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রকৃতির বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম ও ব্লগ সাইটগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশেষে পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলো। আগের পুলিশ বাদী হয়ে করা অজ্ঞাতনামা গুম ও হত্যার মামলার ফাইলটি নতুন করে আইনি টেবিলে খোলা হলো।(চলবে..)
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : ৭
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
28/07/2026
নিজের বাড়ি ফিরতেই মধুর জীবনের অন্ধকার আরও কয়েক গুণ ঘনীভূত হয়ে উঠল। সে ঘরের মূল দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার বাবা কোনো কিছু না জিজ্ঞেস করেই এক প্রচণ্ড চড় মারলেন তার গালে। চড়ের আঘাতে মধুর ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বের হয়ে গেল এবং সে মেঝেতে পড়ে গেল। তার মা এক কোণায় দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল মুখে দিয়ে কাঁদছেন, আর ড্রয়িংরুমের সোফায় পা নাচিয়ে অত্যন্ত আরাম করে বসে আছে সংকর—তাদের পাশের বাড়ির সেই ছেলেটি, যাকে মধু তীব্র ঘৃণা করে। কিন্তু তাকে অপছন্দ করা স্বত্ত্বেও তার সাথেই অনেক দিন ধরে পারিবারিকভাবে বিয়ের কথাবার্তা চলছে। সেই সুবাধে সংকর মধুর গতিবিধির খোঁজ খবরও রাখে টুকটাক। সংকরের মুখে তখন এক কুৎসিত, পৈশাচিক ও বিজয়ী হাসি।
সংকর মধুর দিকে তাকিয়ে উপহাসের সুরে বলল, "কী রে মধু? প্রেমিকের সাথে ডেটিং কেমন হলো? ধানমন্ডির ক্যাফের কফিটা কি খুব মিষ্টি ছিল? নাকি একটু বেশিই তেতো হয়ে গেল শেষ মুহূর্তে?" মধু মেঝেতে বসে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। সংকর কীভাবে জানল সে আজ বিকেলে ধানমন্ডির ক্যাফেতে গিয়েছিল? সে তো কাউকে বলেনি!
মধুর বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন, "তুই একটা মুসলিম ছেলের সাথে প্রেম করছিস! আমাদের বংশের, আমাদের ধর্মের মুখ পুড়িয়েছিস! সংকর আমাদের সব প্রমাণ দেখিয়েছে। তোর ফেসবুকের সব নোংরা মেসেজ, সব কথা ও আমাদের ল্যাপটপে প্রিন্ট করে দেখিয়েছে! তুই আর আমাদের মেয়ে নোস!"
মধু মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিষয়টা বুঝতে পারল, যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে দ্রুত নিজের ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু সংকর সোফা থেকে উঠে এসে এক ঝটকায় তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল। সংকর মধুর মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "তোর ওই সাধের আইডি তো অনেক আগেই আমার দখলে। তুই যখন জঙ্গলে ক্যামেরা নিয়ে পাখি আর বুনো প্রাণী খুঁজে বেড়াতিস, আমি তখন তোর ফোনে আর আইডিতে একটা স্পাইওয়্যার আর ট্রোজান ভাইরাস ঢুকিয়ে রাখছিলাম। তুই কখন কাকে মেসেজ করিস, কখন কার সাথে ফোনে কী কথা বলিস, এমনকি তোর প্রেমিকের সাথে কখন কোথায় দেখা করার প্ল্যান—সব আমার এই ল্যাপটপে লাইভ দেখা যেত। তোর ওই তথাকথিত লেখক আর হ্যাকার প্রেমিককে তো বেশ ভালোই সাইজ করে দেওয়া হয়েছে আজ বিকেলে।"
মধু সংকরের দিকে তীব্র ঘৃণায় আর ক্রোধে তাকাল। তার চোখ দিয়ে তখন আগুন ঝড়ছে। "সংকর! তুই এত নিচু? তুই এত বড় পিশাচ? তুই তারিককে তুলে নিয়েছিস? তুই ওর বৃদ্ধ বাবা-মাকে গুলি করে খুন করেছিস? উত্তর দে!" সংকর হা-হা করে এক অট্টহাসি হেসে উঠল, যা ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। "আমি? আরে আমি তো সামান্য একটা হ্যাকার রে মধু, তোর পাশের বাড়ির চেনা ছেলে। আমি শুধু তোর আইডি হ্যাক করে তোর সব ইনফরমেশন জোগাড় করেছি আর তোর বাবা-মাকে নালিশ করেছি তোকে পাওয়ার জন্য। বাকি কাজ কারা করেছে, তা তো আমি জানি না। তবে হ্যাঁ, তোর ওই প্রেমিক যে একটা জেনুইন অ্যান্টি-ন্যাশনাল এলিমেন্ট আর সাইবার ক্রিমিনাল ছিল, তা তো আমি জানতাম না। সে বড় বড় মহলের গোপন ডাটা চুরি করেছিল, তাই বড় লোকেরাই তাকে তুলে নিয়ে গেছে।"
মধুর বাবা সংকরের কথায় আরও উত্তেজিত হয়ে আর কোনো কথা না শুনে মধুকে চুল ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ভেতরের একটা অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে স্টোর রুমে। মধুকে ভেতরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বাইরে থেকে একটা ভারী লোহার তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। মধুর মা দরজার ওপাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "তুই এই অন্ধকার ঘরেই পচে মরবি, তাও তোকে কোনো মুসলিমের হাতে আমরা দেব না। আমাদের জাত আমরা নষ্ট করতে দেব না।"
অন্ধকার ঘরের ঠাণ্ডা মেঝেতে বসে মধু স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে আর জল বের হচ্ছিল না, কান্নার জায়গাটা এখন দখল করে নিচ্ছিল এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোনের আগুন। সংকর তার আইডি হ্যাক করে রেখেছিল দীর্ঘ দু-বছর ধরে। তার মানে, তারিক আর মধুর প্রতিটি আবেগ, প্রতিটি গোপন কথা, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস সংকর জানত এবং উপভোগ করত। এবং সংকরই এই তথ্যগুলো কোনো এক শক্তিশালী ব্ল্যাক ফোর্সের কাছে চড়া দামে বিক্রি করেছে অথবা তাদের ব্যবহার করেছে তারিককে চিরকালের জন্য ধ্বংস করার জন্য। কিন্তু মধু তো সহজে দমে যাওয়ার মেয়ে নয়। সে একজন বন্য জীবনের সাহসী ফটোগ্রাফার, যে বনের হিংস্র পশুর সামনে একাকী ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিকে থাকতে জানে। সে অন্ধকার ঘরের ভেতরে চারপাশ হাতড়ে দেখতে লাগল যদি কোনো পথ পাওয়া যায়। ঘরটিতে পুরোনো কিছু ভাঙা আসবাবপত্র আর একটা কাঠের টেবিল ছিল। টেবিলের ড্রয়ার টানতেই মধু পেয়ে গেল তার একটা পুরোনো, বাতিল হয়ে যাওয়া স্মার্টফোন—যেটা সে বছরখানেক আগে ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিল। ফোনটিতে কোনো সিম কার্ড ছিল না, কিন্তু অলৌকিকভাবে তার ওয়াই-ফাই অন করা ছিল। আর সৌভাগ্যবশত, এই স্টোর রুমটি ছিল তাদের ড্রয়িংরুমের মেইন রাউটারের একদম কাছে, ফলে দেওয়ালে বাধা সত্ত্বেও ওয়াই-ফাই সিগন্যাল ফুল দেখাচ্ছিল।
মধু কাঁপতে কাঁপতে ফোনটা অন করল। তার মূল ফেসবুক আইডি তো সংকর হ্যাক করে পাসওয়ার্ড বদলে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কিন্তু মধুর কাছে তার পেজের একটা মডারেটর ব্যাকআপ আইডি ছিল, যা সে অন্য একটা জিমেইল দিয়ে খুলেছিল এবং যেটা সংকরের জানার কথা নয়। সে সেই আইডি দিয়ে পেজে লগইন করল। তার পেজের লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার এখনো আছে, তারা এখনো মধুর নতুন ভিডিওর জন্য অপেক্ষা করছে।
মধু সিদ্ধান্ত নিল, সে এই অন্ধকার ঘরে বসে শুধু শুধু কেঁদে নিজের জীবন শেষ করবে না। সে পুরো দুনিয়ার সামনে সংকরের এই নোংরামি, তার ব্ল্যাকমেইল এবং তারিকের গুম ও তার মা-বাবার পেছনের সত্য তুলে ধরবে। সে তার ক্যানন ক্যামেরার বদলে এবার নিজের এই ভাঙা ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরাটা অন করল।(চলবে..)
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : ৬
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
27/07/2026
তারিককে ওভাবে চোখের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর মধুর মাথার ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সে কীভাবে ক্যাফে থেকে বের হলো, কীভাবে একটা সিএনজি ভাড়া করল—তার কিছুই তার মস্তিষ্কে কাজ করছিল না। তার কানের কাছে শুধু একটা কথাই অনবরত তীরের মতো বাজছিল—"আমার বাবা আর মায়ের একটু খেয়াল রেখো, ওদের একটু খোঁজ নিও! এই দায়িত্বটা তোমার!" তারিকের এই শেষ অনুরোধটাই মধুর অবশ শরীরে এক অদ্ভুত শক্তি জোগাল।
তারিকের মেসেজ আর কথাবর্তার সূত্র ধরে মধু তারিকের বাসার ঠিকানাটা মোটামুটি জানত। ঢাকার অদূরে একটা শান্ত ও নিরিবিলি আবাসিক এলাকায় তাদের একতলা ছোট্ট ছিমছাম বাড়ি। সিএনজি যখন সেই বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত, অলৌকিক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। আকাশে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। সাধারণত এই সময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলে ওঠে, রান্নাঘর থেকে রান্নার সুগন্ধ আসে, টিভির খবরের আওয়াজ পাওয়া যায়। কিন্তু এই বাড়িটা সম্পূর্ণ অন্ধকার, যেন কোনো এক শ্মশানপুরী।
মধু কাঁপতে কাঁপতে লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তার পা দুটো যেন মাটিতে দেবে যাচ্ছিল। সে দরজার সামনে গিয়ে কলিংবেলটা চাপল। কোনো সাড়া নেই। সে আবার বেল চাপল, এবারও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। মধুর মনের ভেতর এক অশুভ সংকেত জমা হতে লাগল, এক তীব্র আতঙ্ক তার বুকটাকে চেপে ধরল। সে দরজার হাতলে হাত দিতেই দেখল, দরজাটা লক করা নেই—সামান্য ফাঁকা হয়ে আছে, যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেছে।
মধু আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা তাকে গ্রাস করতে চাইল। সে দেয়াল হাতড়ে ড্রয়িংরুমের মেইন সুইচটা অন করল। আলোটা জ্বালাতেই সে চোখের সামনে যা দেখল, তা দেখার জন্য সে এই পৃথিবীর কোনো জন্মেই প্রস্তুত ছিল না। মধুর মুখ থেকে এক অবরুদ্ধ, তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এল, সে নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল যাতে চিৎকার বাইরে না যায়।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে সোফার পাশে মেঝেতে পড়ে আছেন দুজন মানুষ। তারিকের বাবা আর মা। দু-বছর ধরে ফেসবুকে যে শান্ত, অমায়িক ও হাসিখুশি মুখ দুটো মধু পরম শ্রদ্ধায় দেখে এসেছে, তারা এখন রক্তের এক বিশাল পুকুরে ভেসে যাচ্ছেন। দুজনের বুকেই একাধিক গুলির চিহ্ন। রক্ত মেঝেতে শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, যার অর্থ হত্যাকাণ্ডটি বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে, হয়তো দুপুরে বা সকালে ঘটেছে যখন তারিক অফিসে ছিল। মাটির ওপর রাখা চায়ের কাপ দুটো অর্ধেক খাওয়া অবস্থায় টেবিলের ওপর পড়ে আছে। খুনিরা ঘরে ঢুকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এই বৃদ্ধ দম্পতিকে নৃশংসভাবে খুন করেছে।
মধু মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখের জল আর কোনো বাধা মানল না। সে তারিকের মায়ের ঠান্ডা, নিথর ও রক্তমাখা হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিল। "মা... মাগো, চোখ খোলো। আমি মধু। তারিক আমাকে পাঠিয়েছে আপনাদের কাছে।" কিন্তু ওপার থেকে কোনো উত্তর আসার ছিল না। সেই শান্ত চোখ দুটি চিরকালের জন্য বুজে গেছে।
মেঝেতে বসে কাঁদতে কাঁদতেই মধুর মনে হলো, সে এক ভয়াবহ কোনো ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে পড়েছে। একদিকে তারিককে সবার সামনে থেকে গুম করা, অন্যদিকে তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে এত নৃশংসভাবে হত্যা—এর পেছনে কোনো সাধারণ ডাকাত বা অপরাধী নেই। এর পেছনে রয়েছে কোনো অত্যন্ত শক্তিশালী, রাজনৈতিক বা অন্ধকার কোনো করপোরেট শক্তির হাত। কিন্তু তারা কেন এই নিরীহ পরিবারটির ওপর এভাবে চড়াও হলো? তারিক তো একজন সাধারণ আইটি কর্মী এবং লেখক মাত্র! সে কার কী ক্ষতি করেছিল?
মধু যখন কাঁদছিল, তখন হঠাৎ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে উঠল—এই বাড়িতে আর এক মুহূর্ত থাকা নিরাপদ নয়। খুনিরা হয়তো এখনো আসেপাসে বা কোনো আড়ালে নজর রাখছে। সে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। পুলিশকে খবর দেওয়া দরকার, কিন্তু তার নিজের পরিচয় প্রকাশ পেলে তার নিজের রক্ষণশীল পরিবার এবং সমাজ তাকে জীবন্ত শেষ করে দেবে। তা ছাড়া, তারিকের কোনো আত্মীয়-স্বজনকেও সে চেনে না যাদের সে ডাকবে। সে বাড়ি থেকে দ্রুত বের হয়ে আসার সময় ড্রয়িংরুমের কোণায় একটা ছোট কাঠের টেবিলের ওপর তারিকের একটা ব্যক্তিগত ডায়েরি দেখতে পেল। ডায়েরিটার ওপর তারিকের হাতের লেখা। মধু চিনতে ভুল করলো না হাতের লেখা দেখে যে এটা তারিকেরই। সে এক মুহূর্ত কোন কিছু না ভেবে ডায়েরিটা নিজের ব্যাগে পুরে নিল। হয়তো এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই সব ধ্বংসের মূল চাবিকাঠি। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দরজার কাছে রক্তের ওপর সে একটা বুটের দাগ দেখতে পেল—ঠিক একই রকমের চ্যাপ্টা বুটের দাগ সে আজ ক্যাফেতে সেই কালো পোশাকধারী লোকগুলোর পায়ে দেখেছিল। এর অর্থ খুনিরা একই দল।
মধু অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এবং নিজের শরীরকে কোনোমতে টেনে নিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সে জানত না, তার নিজের বাড়িতে তার জন্য আরও বড় এক নরককুণ্ড ও কারাগার অপেক্ষা করছে। তার চোখের সামনে এখন শুধু তারিকের সেই আকুল মুখটা ভাসছে। সে নিজের চোখের জল মুছে নিজেকে বলল—"আমি ভেঙে পড়ব না তারিক। যারা তোমার আর তোমার পরিবারের এই অবস্থা করেছে, আমি তাদের শেষ দেখে ছাড়ব। আমি এর বিচার করবই।" (চলবে..)
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : ৫
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
26/07/2026
ঢাকার ধানমন্ডির একটা নিরিবিলি, কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অভিজাত ক্যাফে। মৃদু ওল্ড স্কুলের ব্লুজ গান বাজছে ব্যাকগ্রাউন্ডে, যা পরিবেশটাকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলেছে। একদম কোণায় একটা টেবিল বুক করে বসে ছিল তারিক। তার পরনে ছিল নেভি ব্লু কালারের একটা সুন্দর শার্ট, চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। টেবিলে রাখা কফি কাপের ধোঁয়া অনবরত ওপরে উঠছে। তারিকের হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল এক তীব্র উত্তেজনায় ও ভালোলাগায়।
ঠিক বিকেল চারটায় ক্যাফের কাচের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল মধু। অফ-হোয়াইট কালারের একটা সুন্দর কুর্তি পরেছে সে, চুলে কোনো বাঁধন নেই—তা কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। ক্যাফের মৃদু আলোর ছায়ায় মধুকে দেখেই তারিক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দু-বছর ধরে স্ক্রিনের ওপারে দেখা মুখটা আজ তার থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
মধু তারিকের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। ল্যাপটপের ছবির চেয়ে বাস্তব তারিক আরও অনেক বেশি সুন্দর ও স্মার্ট। তার চোখের সেই গভীর ও বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি মধুকে মুহূর্তেই গ্রাস করে নিল। দুজনেই কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন মুখের সমস্ত ভাষা কোনো এক জাদুতে হারিয়ে গেছে। তারিক মৃদু হেসে তার সেই চেনা গম্ভীর গলায় বলল, "বসবে না? নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমার গল্প পড়বে?" মধু আলতো করে লজ্জা পেয়ে চেয়ার টেনে বসল। তার বুকটা তখন ধড়ফড় করে কাঁপছে। ওয়েটার এসে কফির অর্ডার নিয়ে গেল।
প্রথমে কিছুটা আড়ষ্টতা ও জড়তা থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের ভেতরের সেই চেনা আন্তরিকতা আর খুনসুটি ফিরে এল। তারা হাসল, গল্প করল, একে অপরের লেখার খুঁটিনাটি নিয়ে মেতে উঠল। কিন্তু মধুর চোখে একটা চাপা উদ্বেগ আর ভয়ের ছায়া ছিল, যা তারিক লক্ষ্য করল।
তারিক মধুর হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে আশ্বস্ত করে বলল, "মধু, আমি জানি আমাদের পথটা সহজ নয়। কিন্তু আমি আমার বাবা-মার সাথে আমাদের ব্যাপারে কথা বলেছি। তারা খুব উদার মনের মানুষ, তারা কোনো জাত-পাত মানেন না। তারা শুধু আমার খুশি চান। প্রয়োজনে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব, কিন্তু তোমাকে আমি কোনোভাবেই সংকরের মতো কোনো পিশাচের হাতে ছেড়ে দেব না। তুমি শুধু নিজের ওপর ভরসা রাখো।"
ঠিক তখনই ক্যাফের ভেতরের শান্ত বাতাসটা কেমন যেন এক নিমেষে বদলে গেল। ব্যাকগ্রাউন্ডের সেই সুন্দর মিউজিকটা হঠাৎ বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ক্যাফের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে চারজন লম্বা, চওড়া লোক হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল। তাদের সবার পরনে কুচকুচে কালো পোশাক, মুখে কালো মাস্ক পরা। ক্যাফের কর্মচারীরা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই একজন লোক কোমরের থেকে একটা ভারী পিস্তল বের করে কাউন্টারের দিকে তাক করল।
ক্যাফের ভেতরে থাকা অল্প কয়েকজন কাস্টমার ভয়ে চিৎকার করে টেবিলের নিচে ঢুকে গেল। লোকগুলো চারপাশ না তাকিয়ে সরাসরি এগিয়ে এল তারিক আর মধুর টেবিলের দিকে। মধুর বুকটা এক অজানা আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। সে ভাবল এরা হয়তো কোনো ডাকাত দল, টাকার জন্য এসেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে নিজের হাতব্যাগটা এগিয়ে দিতে গেল।
কিন্তু কালো পোশাকধারী লোকগুলোর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট ছিল। তারা মধুর দিকে একবারও তাকালও না। দুজন লোক হিংস্রভাবে তারিকের দুই হাত চেপে ধরল এবং চেয়ার থেকে টেনে তুলল। তারিক নিজেকে মুক্ত করার জন্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই একজন তার পেটে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে এক প্রচণ্ড আঘাত করল। তারিক যন্ত্রণায় নীল হয়ে কুঁকড়ে গেল।
মধু চিৎকার করে উঠল, "ছেড়ে দিন ওকে! আপনারা কারা? কেন ওকে মারছেন? ও তো কোনো অপরাধ করেনি!" সে লোকগুলোর হাত থেকে তারিককে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু একজন লোক মধুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ফেলে দিল।
কোনো কথা না বলে, কোনো কারণ না দেখিয়ে লোকগুলো অত্যন্ত নিপুণ ও পেশাদারভাবে তারিককে টেনে দরজার দিকে নিয়ে যেতে লাগল। ক্যাফের ম্যানেজার পুলিশে ফোন করার চেষ্টা করতেই একজন কালো পোশাকধারী তার হাতের ফোনটা কেড়ে নিয়ে মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল এবং পিস্তল দিয়ে তাকে হুমকি দিল।
তারিককে যখন দরজার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে নিজের শেষ শক্তি দিয়ে মধুর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন নিজের জীবনের জন্য কোনো ভয় বা শঙ্কা ছিল না, ছিল মধুর নিরাপত্তার জন্য এক চরম উদ্বেগ। সে চিৎকার করে বলল, "মধু! প্লিজ ভেঙে পড়ো না। আমার বাবা-মাকে দেখার আমি ছাড়া কেউ নেই, প্লিজ আমার বাবা আর মায়ের একটু খেয়াল রেখো, ওদের একটু খোঁজ নিও! এই দায়িত্বটা আজ থেকে তোমার!"
পরের মুহূর্তেই লোকগুলো তারিককে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গেল এবং একটি কালো গ্লাসের মাইক্রোবাসে তুলে নিল। গাড়িটি কর্কশ শব্দ করে চোখের পলকে মেইন রোড দিয়ে উধাও হয়ে গেল। মধু ক্যাফের বাইরে এসে রাস্তার মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যেন তীব্র গতিতে ঘুরতে শুরু করেছে। একটু আগেও যে মানুষটা তার সামনে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, সে এখন এক অজানা, অন্ধকার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে নিখোঁজ। কোনো কারণ নেই, কোনো দাবি নেই—চারপাশে শুধু এক নিরেট ও রহস্যময় অন্ধকার।
(চলবে..)
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : ৪
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
25/07/2026
মেসেজটা পাঠানোর পর থেকে মধুর সময় যেন আর কাটতেই চাইছিল না। সে বারবার নিজের ফোন চেক করছে, ফেসবুকের ডাটা অন-অফ করছে, তারিকের আইডিতে সবুজ বাতি জ্বলছে কিনা দেখছে। এক তীব্র ছটফটানি আর অজানা এক উত্তেজনা তাকে গ্রাস করেছে, যা তার বাইশ বছরের গোছানো জীবনে কখনো ঘটেনি। সাধারণত ছেলেরা তার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করে, আর আজ সে নিজে এক অন্য মানুষের উত্তরের জন্য চাতক পাখির মতো বসে আছে। অবশেষে ঠিক তিন ঘণ্টা পর ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। তারিকের মেসেজ এসেছে।
"আমি কি কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখছি? প্রকৃতির রানী স্বয়ং আমার ইনবক্সে পা রেখেছেন? নাকি এটা আমার কোনো গল্পের কাল্পনিক চরিত্র?" তারিকের লেখার এই সহজ অথচ গভীর রোমান্টিক ভঙ্গিটা মধুকে প্রথম মুহূর্তেই মুগ্ধ করল।
সেই রাত থেকে শুরু হলো তাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। প্রথমে ছিল কেবলই লেখার প্রশংসা, ভিডিওর টেকনিক্যাল আলোচনা, তারপর আস্তে আস্তে সেই অক্ষরের সেতু রূপ নিল ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের গভীর গল্পে। তারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেক্সটে কথা বলতে লাগল। তারিক জানতে পারল মধুর ফটোগ্রাফির প্রতি এই তীব্র পাগলামির কথা, কীভাবে সে বনের মধ্যে একাকী ঘুরে বেড়ায়, কীভাবে একটা ভালো শটের জন্য নিজের খাওয়া-দাওয়া, ঘুম সব ভুলে যায়। আর মধু জানতে পারল তারিকের জীবনের একাকীত্ব আর নীরবতার গল্প।
তারিক একটা নামী প্রাইভেট ফার্মে সাইবার সিকিউরিটি ও আইটি কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করে। বাড়িতে শুধু তার বৃদ্ধ বাবা-মা। সে খুব একটা বাইরে যায় না, বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা বা সামাজিক অনুষ্ঠান সে একদম পছন্দ করে না। তার পুরো জগতটা জুড়ে আছে কম্পিউটার কোডিংয়ের জটিল ভাষা, তার নিজের লেখা কিছু অপ্রকাশিত গল্পের খাতা আর এখন—মধু। মধু যেন তার সেই নীরব জগতে এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালের মতো প্রবেশ করেছে।
কথায় কথায় একদিন গভীর রাতে মধু জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা তারিক, তুমি এত চমৎকার গল্প লেখো, মানুষের আবেগ নিয়ে এত সুন্দর খেলতে পারো, কিন্তু তোমার আইডিতে কোনো ফ্রেন্ড নেই কেন? কাউকে দেখাও না কেন তোমার এই অমূল্য লেখাগুলো?" স্ক্রিনের ওপার থেকে তারিকের উত্তর এল, "সবাই গল্প পড়তে ভালোবাসে না মধু। এই যান্ত্রিক শহরের মানুষ শুধু টাকার ভাষা বোঝে, আবেগের নয়। আর আমি চাইনি আমার মনের কথাগুলো সস্তা লাইক-কমেন্টের ভিড়ে হারিয়ে যাক বা কেউ সেটা নিয়ে উপহাস করুক। আমি একজন খাঁটি সমঝদার পাঠকের অপেক্ষায় ছিলাম। এখন তো আমি আমার সেরা পাঠককে পেয়ে গেছি। আমার সব গল্প এখন থেকে শুধু তোমার জন্য লেখা হবে।"
এই কথাগুলো মধুর বুকে গিয়ে তীরের মতো বিঁধত। ভালোবাসার এই তীব্রতা, এই গভীর সম্মান সে আগে কখনো কোনো পুরুষের চোখে বা কথায় দেখেনি। তারিক যখন মেসেজে মধুর রূপের আর তার কাজের বর্ণনা দিত, তখন মধুর মনে হতো সে সত্যি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী ও সুন্দরী নারী। তাদের প্রেম ছিল একদম খাঁটি, কোনো কৃত্রিমতা বা আধুনিকতার সস্তা চটুলতা ছিল না সেখানে। প্রযুক্তির এই যুগে এসেও তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেক্সটে একে অপরকে কবিতা শোনাত, নিজের ভালোলাগার অনুভূতিগুলো শেয়ার করত।
আস্তে আস্তে দিন কাটল, মাস পার হলো। তাদের সম্পর্কটা এখন আর শুধু টেক্সটের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রইল না। তারা রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলতে শুরু করল। তারিকের কণ্ঠস্বর ছিল ভীষণ গম্ভীর, শান্ত এবং পুরুষালী, যা মধুর কানে মধুর মতো বর্ষিত হতো। মধু যখন হাসত, তারিক বলত, "তোমার এই হাসির শব্দটা যদি আমি কোনো কোডিং দিয়ে চিরকালের জন্য সিস্টেমে ধরে রাখতে পারতাম, তবে ওটাই হতো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সফটওয়্যার। আমার সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষে দূর হয়ে যায় এই হাসিতে।"
কিন্তু এই ঘনঘোর ভালোবাসার মেঘের আড়ালে একটা বড়সড় পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিল, যা তারা দুজনেই জানত কিন্তু মুখে প্রকাশ করত না। তা হলো তাদের ধর্মীয় পরিচয়। মধু রক্ষণশীল সনাতন হিন্দু পরিবারের মেয়ে, আর তারিক মুসলিম। সমাজ আর ধর্মের এই প্রাচীন দেয়াল যে কতটা কঠোর ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তা দুজনেই খুব ভালো করে জানত। কিন্তু প্রেমের বুনো আবেগ কি আর কখনো কোনো জাত-পাত বা ধর্মের সীমানা মেনেছে? যখন দুটি ভিন্ন ধর্মের আত্মা একে অপরের সাথে মানসিকভাবে মিশে যায়, তখন পৃথিবীর সব নিয়ম, সব সামাজিক বাধা সেখানে তুচ্ছ ও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। তারা একে অপরের প্রতি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে ভালোবাসার সাগরে তারা অনবরত হাবুডুবু খেতে লাগল।
একদিন কথায় কথায় মধু কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে বলল, "তারিক, আমাদের এই সম্পর্কের শেষ কোথায়? আমার পরিবার যদি জানতে পারে, তবে আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে। আমাদের সমাজ আমাদের মেনে নেবে না। তুমি কি ভয় পাও না?" ফোনের ওপার থেকে তারিক কিছুক্ষণ গভীর নীরবতায় ডুবে রইল। তারপর এক দৃঢ় ও প্রত্যয়ী গলায় বলল, "আমি শুধু একটা জিনিসকে ভয় পাই মধু—তোমাকে হারানোর কষ্টকে। এই মহাবিশ্বে তোমাকে ছাড়া আমার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। বাকি পৃথিবীর কোনো ঝড় বা কোনো ধর্মকে আমি ভয় পাই না। তুমি শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখো, বাকি পথ আমি একাই পাড়ি দেব।"
মধু চোখের জল মুছে মৃদু হাসল। সে মনে মনে ঠিক করে নিল, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সে তারিকের হাত ছাড়বে না। তাদের এই ভার্চুয়াল ভালোবাসা এখন এক তীব্র শারীরিক উপস্থিতির জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষটাকে সামনাসামনি দেখার জন্য, একে অপরের চোখের ভাষা পড়ার জন্য তারা দুজনেই ছটফট করতে লাগল।
মধু একদিন কিছুটা জেদ ধরেই বলল, "অনেক হয়েছে অনলাইন প্রেম। এবার আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই, তারিক। সামনাসামনি বসে তোমার চোখে চোখ রেখে বলতে চাই—আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। আমি দেখতে চাই আমার লেখক চোখের সামনে বসে কীভাবে কথা বলে।" তারিক প্রথমে তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছুটা ইতস্তত করলেও মধুর এই পবিত্র আবেগের কাছে তাকে হার মানতে হলো। সিদ্ধান্ত হলো, আগামী শুক্রবার ঢাকার একটা নিরিবিলি, শান্ত রেস্টুরেন্টে তারা প্রথম দেখা করবে।
মধু তখনো জানত না, এই বহুল প্রতীক্ষিত প্রথম দেখাই তাদের জীবনে এক চরম বিভীষিকাময় ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। (চলবে..)
গল্প: অপূর্ণ পরিণয়
পর্ব : ৩
গল্পকার : এইচ আমীম (AMIM)
Category
Contact the public figure
Telephone
Website
Address
Jaynagar, Gobindopur, Shyamnagar
Satkhira
Alerts
Be the first to know and let us send you an email when AMIM posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.